বগুড়ায় ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে জেঁকে বসেছে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। গত সাত দিনে এই জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে বগুড়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। হাসপাতালের ইনডোর থেকে শুরু করে বারান্দার ফ্লোর পর্যন্ত কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বেড না পেয়ে অনেক মা তাদের কোলের শিশুকে নিয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে হাসপাতালের গুমোট পরিবেশে রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে কেবল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েই ৯০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নতুন করে আরও ১৯ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ৬৫ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশই ১২ বছরের ঊর্ধ্বের শিশু এবং নারী-পুরুষ।
এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ২৫ মার্চ রাতে জাফর মন্ডল (৬০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু শোকের ছায়া ফেলেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ভর্তির অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম (রনি) পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, “ঈদের পর খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন এবং তীব্র গরমের কারণেই মূলত এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ জন নতুন রোগী আসলেও দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে তারা সুস্থ হয়ে উঠছেন।”
বগুড়ার সিভিল সার্জন খুরশীদ আলম জানান, গরমের এই মৌসুমে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়াটা অনেকটা স্বাভাবিক হলেও তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা ‘ডায়রিয়া ইউনিট’ এবং ‘ওআরটি (ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি) কর্নার’ চালু করা হয়েছে। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন ও ওষুধের মজুত রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের সময় অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার গ্রহণ এবং বাইরের খোলা পানীয় পান করার ফলে পাকস্থলীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করা এবং বাসি-খোলা খাবার পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বগুড়ার এই স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এখন জনসচেতনতাই বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

