সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কবির নগর গ্রাম এখন এক নিস্তব্ধ শোকের চাদরে ঢাকা। গ্রামের ১৯ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ আবু ফাহিমের মৃত্যুর সংবাদে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পরিবারের অভাব ঘোচাতে আর উন্নত জীবনের আশায় যে ছেলেটি সুদূর লিবিয়া পাড়ি দিয়েছিল, আজ তার নিথর অস্তিত্ব সাগরের অতলে।
দেশে থাকতে ফাহিমের জীবন ছিল অনেকটা রঙিন। দামী মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো আর শৌখিনতার মাঝে বেড়ে ওঠা এই তরুণ ছিল বাবা-মায়ের নয়নের মণি। কিন্তু সৌদি প্রবাসী বাবার একার আয়ে পরিবারের টানাপোড়েন মেটাতে ফাহিম সিদ্ধান্ত নেন নিজের কাঁধে হাল ধরার। সেই সুপ্ত বাসনা থেকেই লিবিয়া হয়ে ইউরোপের পথে পা বাড়ানো।
লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা একটি ট্রলারে চড়ে ফাহিম যখন ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশিতে ভেসেছিলেন, তখন তার চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু প্রকৃতি আর ভাগ্য তার সহায় ছিল না। উত্তাল সাগরের মাঝে ইঞ্জিন বিকল হয়ে তাদের নৌকাটি দীর্ঘ ছয় দিন লক্ষ্যহীনভাবে ভাসতে থাকে।
মাঝ সমুদ্রে খাবার আর পানির তীব্র হাহাকারে একে একে নিভে যেতে থাকে প্রাণের স্পন্দন। সেই কাফেলায় থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে ফাহিমই ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ। ক্ষুধা আর তৃষ্ণার যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই সম্ভাবনাময় তরুণ। তার সেই সোনালী স্বপ্নগুলো লোনা পানির অতলে তলিয়ে যায় চিরতরে।
মৃত্যুর প্রহর গোনার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ফাহিমের মনে ছিল তার মায়ের কথা। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক আবেগঘন পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “বোকা-সোকা আম্মুটাই দিনশেষে আমার জন্য কাঁদে, মন খারাপ করে, মন ভরে দোয়া করে!” ভিডিওতে মানিব্যাগে রাখা মায়ের ছবি দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, দেশে থাকতে যে ছেলে এক গ্লাস পানিও নিজে গড়িয়ে খায়নি, তাকেই এখন যন্ত্রণাময় কঠিন বাস্তবতার মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সেই আকুতি আজ কেবল এক টুকরো স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। ফাহিমের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই তার মা হেলেনা বেগম শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস যেন বিদীর্ণ হচ্ছে। “আমার বুকের ধনকে আমি আর ফিরে পাব না, আমার সব শেষ হয়ে গেল,”—বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এই অভাগী মা।
ছেলের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না সৌদি আরবে কর্মরত বাবা ফয়েজ উদ্দিনও। একমাত্র সন্তানের মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সন্তানের শেষ বিদায়ে পাশে থাকা তো দূরের কথা, তার মরদেহটি পর্যন্ত একবার ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পাননি এই বাবা-মা।
সমুদ্রের মাঝপথে মারা যাওয়ায় ফাহিমের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এক অনিশ্চিত প্রক্রিয়ার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইন এবং সাগরের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন মৃত্যুবরণকারীদের দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। একটি পরিবারের সব আলো এক নিমিষেই নিভে গেছে সাগরের নোনা জলে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরূপ রতন সিংহ নিহত ফাহিমের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “একটি টগবগে তরুণের এভাবে অকাল মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।”
ইউএনও আরও যোগ করেন যে, ইউরোপে গেলেই ভাগ্য বদলে যাবে—এমন ভুল ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অবৈধ আর ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে জীবন বাজি রেখে যাত্রা করার এই প্রবণতা বন্ধ না হলে এমন করুণ ট্র্যাজেডি বারবার ফিরে আসবে। ফাহিমের মৃত্যু যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
হাওর পাড়ের জনপদ সুনামগঞ্জে ফাহিমের মতো অনেক তরুণই আজ বিদেশের হাতছানিতে মোহাচ্ছন্ন। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেক পরিবার। ফাহিমের শূন্য বাড়ি আর তার মায়ের শূন্য কোল এখন যেন সেই সর্বনাশা পথের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একটি রঙিন জীবনের অপমৃত্যু আর তার পেছনে পড়ে থাকা একরাশ হাহাকার—এটাই যেন বর্তমান সময়ের অবৈধ অভিবাসনের এক নগ্ন রূপ। ফাহিম হয়তো তার গন্তব্যে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার এই যাত্রা শেষ হলো এক গভীর দীর্ঘশ্বাসে। পরিবারটির এখন একটাই আকুতি, অন্তত তাদের সন্তানের চিহ্নটুকু যেন ফিরে পান তারা।
কিন্তু উত্তাল সমুদ্র কি তার গিলে নেওয়া প্রাণ সহজে ফিরিয়ে দেয়? কবির নগরের এই গ্রামটি এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায় দিন গুনছে। ফাহিমের শূন্য ঘরে তার ব্যবহৃত জিনিসগুলো পড়ে আছে, নেই শুধু সেই প্রাণবন্ত ছেলেটি। তার এই মৃত্যু আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, স্বপ্নের মূল্য কখনো নিজের জীবনের চেয়ে বেশি হতে পারে না।
উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত, কিন্তু সেই পথ যখন মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়, তখন সেই স্বপ্নের কোনো সার্থকতা থাকে না। ফাহিমের এই প্রস্থান এক গভীর ক্ষত রেখে গেল তার পরিবারের হৃদয়ে, যা হয়তো কোনো দিনও উপশম হবার নয়।

