চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে হামের সংক্রমণ এখন রীতিমতো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে কক্সবাজার, চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলায় এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কেবল আক্রান্তের সংখ্যাই বাড়ছে না, বরং হাম-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত ১০ দিনে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যমতে, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৫ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬৪ জন, যার মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন এবং কুমিল্লায় ১৮ জন। তবে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়া রোগীর বাইরেও বিপুল সংখ্যক শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই; সেখানে ডেঙ্গু কর্নারকে বর্তমানে ‘হাম কর্নার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ‘পোস্ট-মিজেলস নিউমোনিয়া’ বা হাম-পরবর্তী ফুসফুসের সংক্রমণ শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই ভাইরাস হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে একজনের থেকে ১৮ জন পর্যন্ত ছড়াতে পারে। পুষ্টিহীনতা ও টিকার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুছা মিঞা জানান, গত এক সপ্তাহে নিয়মিত বিরতিতে রোগী আসছে। বর্তমানে সেখানে ১২ জন শিশু চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে ১৫ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের অনেকের বয়সই ১৫ মাসের নিচে, অর্থাৎ তারা এখনো পূর্ণাঙ্গ টিকার আওতায় আসেনি। এমনকি ৬ মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতালের চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে গত ১০ দিনে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে আইসিইউতে ৬ জন শিশু জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এক শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। সব মিলিয়ে বন্দরনগরীর হাসপাতালগুলোতে হামের জটিলতা নিয়ে আসা রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক করা হয়েছে। তিনি বলেন, “হামের উপসর্গ থাকা রোগীরা প্রায়ই নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতায় মারা যাচ্ছে। আমরা ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি। বর্তমানে টিকার কোনো সংকট নেই, তবে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।”
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, হাটহাজারী ও বোয়ালখালীতে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ১২০টি বাড়ি পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। মূলত ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচিতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাবেই বর্তমানের এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ—শিশুর শরীরে র্যাশ বা লালচে দানা ওঠার পাশাপাশি জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এই মুহূর্তে একমাত্র সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে টিকাদানই পারে শিশুদের এই মরণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করতে।

