২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আইকন, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আজ রোববার (২৯ মার্চ) রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি জীবন-মৃত্যুর এক কঠিন লড়াইয়ে লড়ছেন।
মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ রোববার রাত ৮টায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে বাবার জন্য দোয়া চেয়েছেন। তিনি জানান, তাঁর বাবা একটি ‘মেজর হার্ট অ্যাটাক’-এর শিকার হয়েছেন এবং সোমবার তাঁর হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করা হবে।
“সাহসী মানুষটি আজ অসুস্থতায় কাবু”
স্নিগ্ধ তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “এনজিওগ্রামে দেখা গেছে আব্বুর হৃদপিণ্ডে অসংখ্য ব্লক ধরা পড়েছে। আমরা আব্বুকে কখনো এত বড় অসুস্থতায় পড়তে দেখিনি। ছোটখাটো সমস্যা হলে তিনি আমাদের জানাতেনও না, নিজেই ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে যেতেন। আমাদের পরিবারের সবচেয়ে সাহসী মানুষটি আজ হাসপাতালের বিছানায়।”
স্নিগ্ধ আরও উল্লেখ করেন যে, ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে মুগ্ধকে হারানোর পর থেকেই তাঁর বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করলেও প্রিয় সন্তানের বিয়োগব্যথা তাঁকে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। স্নিগ্ধর মতে, “আপনারা যে মানবিক মুগ্ধকে দেখেছিলেন, সে ছিল পুরোপুরি আব্বুরই প্রতিচ্ছবি।”
ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাস
স্নিগ্ধর এই ফেসবুক পোস্ট থেকে উঠে এসেছে তাঁর বাবার এক অজানা রাজনৈতিক অধ্যায়। তিনি জানান, মীর মুস্তাফিজুর রহমান নব্বইয়ের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিএনপির একজন অত্যন্ত একনিষ্ঠ ও ত্যাগী কর্মী।
স্নিগ্ধ বলেন, “আমার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পেছনে আব্বুর হাতটাই সবচেয়ে বড়। তিনি বিএনপি দলটিকে অনেক বিশ্বাস করেন। আমরা তিন ভাই অরাজনৈতিক হলেও তাঁর নির্দেশ ছিল, রাজনীতি করলে এই দল থেকেই করতে হবে। জানি না, এই দলটা একজন শহীদের পিতার বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রাখতে পারবে কি না।”
মুগ্ধর স্মৃতি ও জুলাই অভ্যুত্থান
শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ছিলেন ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক প্রাণোচ্ছ্বল মুখ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী মৃত্যুর আগে বিইউপি থেকে এমবিএ করছিলেন। ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে যখন পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল, তখন মুগ্ধ নিজের জীবন বাজি রেখে শিক্ষার্থীদের মাঝে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন।
“পানি লাগবে কারও, পানি?”—মুগ্ধর এই শেষ বাক্যটি এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিনশ্বর প্রতীক। পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন। মুগ্ধর আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইলে হলেও বেড়ে ওঠা ঢাকার উত্তরায়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সোমবারের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাগতে পারে। একজন বীর শহীদের পিতার সুস্থতার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে বিশেষ প্রার্থনা ও আশীর্বাদ কামনা করা হয়েছে।

