২৬ মার্চ, ২০২৬। তারিখটি হয়তো ক্যালেন্ডারে ছুটির দিন ছিল, কিন্তু রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দিনটি শুরু হয়েছে এক চরম হাহাকার আর লাশের সারি গুনে। পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের নিচে তলিয়ে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি থেকে আজ আরও তিনটি মরদেহ উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। এ নিয়ে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৬ জনে।
বৃহস্পতিবার দুপুরের তপ্ত রোদে যখন পদ্মা পাড়ে স্বজনদের আহাজারি আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে, ঠিক তখনই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা নিশ্চিত করেন সর্বশেষ উদ্ধারকাজের তথ্য। বেলা সোয়া ১২টার দিকে তিনি সাংবাদিকদের জানান, নতুন করে উদ্ধার হওয়া তিনজনের মধ্যে কালুখালির বোয়ালিয়া গ্রামের সানাউল্লাহর ছেলে মো. জাহাঙ্গীর (৫৫) অন্যতম। তার মরদেহটি উদ্ধার করা হয় বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ উদ্ধার করা হয়েছিল উজ্জ্বল খানের (৩০) নিথর দেহ। তিনি কালুখালি উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ঝাউগ্রামের মজনু খানের সন্তান। ঠিক এক ঘণ্টা পর, সাড়ে ১০টায় উদ্ধার করা হয় আশরাফুল (৩৫) নামের আরেক যুবকের মরদেহ। নিহত আশরাফুল উপজেলার বেলগাছি গ্রামের আফসারের ছেলে। স্বজনদের শেষবারের মতো দেখার আকুতি আর কান্নার রোলে পুরো ঘাট এলাকা এখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বুধবার বিকেলে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট সংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক অবহেলার চিত্র। বিকেল ৫টার কিছুক্ষণ পর ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে এসে পৌঁছায়। সে সময় একটি ফেরি সবেমাত্র ঘাট ছেড়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। বাসটি অল্পের জন্য সেই ফেরিটি ধরতে পারেনি, তাই চালক পন্টুনের ওপর পরবর্তী ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ঠিক সোয়া ৫টার দিকে ঘটে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন। ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি বা ছোট ফেরি দ্রুতগতিতে এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির সেই প্রচণ্ড ধাক্কায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকা বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পিছলে পড়ে যায় উত্তাল পদ্মার বুকে। চোখের পলকে বাসটি তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের বের হওয়ার সুযোগ ছিল যৎসামান্য। সেই থেকে শুরু হয় এক দীর্ঘ উদ্ধার প্রক্রিয়া।
রাতভর চলে ফায়ার সার্ভিসের শ্বাসরুদ্ধকর তল্লাশি। আজ সকাল পর্যন্ত মোট ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। দুপুরের নতুন তিনটিসহ সংখ্যাটি এখন ছাব্বিশ। ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিটের অন্তত ১৫ জন অভিজ্ঞ ডুবুরি বর্তমানে নদীতে কাজ করছেন। তাদের সহায়তায় রয়েছে কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অন্ধকার আর নদীর স্রোতকে উপেক্ষা করেই চলছে নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান।
পদ্মা পাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনাতীত। কেউ তার হারানো ভাইয়ের জন্য চিৎকার করছেন, কেউবা প্রিয় সন্তানের নিথর দেহের পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। ঘাটের পাশে সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কফিন। একেকটি মরদেহ যখন নদী থেকে তোলা হচ্ছে, তখন অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন এক আতঙ্কের ঢেউ—এই বুঝি আমার স্বজনটির দেখা মিলল।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস ঘটনাস্থল থেকে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া ২৬টি মরদেহের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৩টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি তিনটি মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এখন প্রক্রিয়াধীন। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুতই তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ-এর কর্মকর্তারা এখন ব্যস্ত হ্যান্ড মাইকে বারবার ঘোষণা দিতে। কারো কোনো প্রিয়জন এখনো নিখোঁজ থাকলে তাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলা হচ্ছে। ঘাটের তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেনের কণ্ঠেও ফুটে উঠেছে বিষণ্ণতা। তিনি বলেন, চোখের সামনে আস্ত একটা বাস এভাবে তলিয়ে যেতে দেখাটা এক দুঃস্বপ্নের মতো। ফেরির ধাক্কাটা এতই জোরালো ছিল যে চালকের কিছু করার ছিল না।
দুর্ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে ফেরি চালনার দক্ষতা এবং ঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। কেন একটি ফেরি পন্টুনে এসে এত জোরে ধাক্কা মারল, সেটি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে আপাতত সবার মনোযোগ উদ্ধার অভিযানে। নদীর তলদেশে আরও কেউ আটকে আছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তল্লাশি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা।
পদ্মার চরে বালু উড়ে এসে পড়ছে স্বজনদের চোখে, কিন্তু তাদের অশ্রু থামার কোনো লক্ষণ নেই। রাজবাড়ীর এই নিঝুম দুপুর আজ ভারী হয়ে আছে স্বজন হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাসে। এই ২৬টি প্রাণ শুধু পরিসংখ্যান নয়, ২৬টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। যারা বাড়ি ফেরার জন্য বাসে উঠেছিলেন, তারা ফিরছেন লাশ হয়ে, কাঁধে চড়ে।
উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হাল ছাড়ছেন না। নদী থেকে বাসটি টেনে তোলার পর সেটির ভেতরে আরও তল্লাশি চালানো হবে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, অলৌকিক কিছুর আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এখন এক শোকাতুর জনপদ, যেখানে উত্তাল পদ্মার গর্জনের চেয়েও মানুষের কান্নার শব্দ জোরালো হয়ে উঠেছে।

