আধুনিক আইন ও বিচার ব্যবস্থার যুগেও মাঝে মাঝে এমন কিছু ‘সামাজিক বিচার’ সামনে আসে যা মানুষকে মধ্যযুগীয় প্রথার কথা মনে করিয়ে দেয়। নোয়াখালীর সেনবাগে জন্মদাত্রী মাকে মারধর এবং খাবার না দেওয়ার অপরাধে এক যুবককে গলায় কলস ঝুলিয়ে পুরো বাজার প্রদক্ষিণ করানো হয়েছে। রোববার সকালে উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে এই ব্যতিক্রমী ও লজ্জাজনক শাস্তি কার্যকর করা হয়।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মোহাম্মদ সহিদ নামের এক দিনমজুর যুবক, যিনি ওই ইউনিয়নের চিলাদি গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাড়িতে খাসির মাংস রান্না করা হলেও বৃদ্ধ মাকে তার এক টুকরোও দেননি সহিদ। ক্ষুধার্ত মা যখন খাবারের জন্য আকুতি জানান, তখন ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধর করেন এই যুবক। অসহায় মা নিরুপায় হয়ে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে অভিযোগ জানালে শনিবার রাতে স্থানীয় চৌকিদার দিয়ে সহিদকে ধরে আনা হয়।
রোববার সকালে ছাতারপাইয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান জনসমক্ষে এই বিচারের রায় দেন। শাস্তির অংশ হিসেবে সহিদের গলায় একটি মাটির কলস ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং তাতে পানি ভর্তি করে পুরো বাজার ঘোরানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গলায় কলস নিয়ে জনাকীর্ণ বাজারের মাঝ দিয়ে হাঁটার সময় সহিদকে চিৎকার করে বলতে বাধ্য করা হচ্ছে, “এই শাস্তি কিসের লাই? মারে মারার লাইগা।”
বিচার চলাকালীন ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে এক কঠোর বার্তা দেন। তিনি বলেন, “কোনো সন্তান যদি মা-বাবাকে খেতে না দেয় বা গায়ে হাত তোলে, তবে তাকে থানায় পাঠানোর প্রয়োজন নেই। আমরা সামাজিকভাবেই তাদের এমন শিক্ষা দেব যা সারাজীবন মনে থাকবে। এই যুবক পুরো বাজারে হাঁটবে এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করবে যাতে আর কেউ এমন সাহস না পায়।”
এই ঘটনাটি নোয়াখালী জুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদল মানুষ মনে করছেন, বর্তমান সময়ে যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা নিজ সন্তানদের হাতে অবহেলিত হচ্ছেন, সেখানে এই ধরনের ‘সামাজিক লজ্জা’ জেলহাজতের শাস্তির চেয়েও বেশি কার্যকর। তাদের মতে, লোকচক্ষুর সামনে এই অপমান দেখে অন্য অবাধ্য সন্তানরা অন্তত সতর্ক হওয়ার শিক্ষা পাবে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সচেতন কিছু মানুষ মনে করছেন, অপরাধ যাই হোক না কেন—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা কাউকে এভাবে জনসমক্ষে হিউমিলিয়েট করা আধুনিক সমাজব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে সেনবাগের স্থানীয় জনতা এই রায়কে সমর্থন জানিয়ে বলছেন, পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং বৃদ্ধদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের তাৎক্ষণিক শাসনের কোনো বিকল্প নেই।
নোয়াখালীর এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিক যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের নিজস্ব পদ্ধতিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সহিদের গলার সেই কলসটি কেবল একটি মাটির পাত্র ছিল না, বরং তা ছিল সমাজের প্রতিটি অবাধ্য সন্তানের জন্য এক প্রতীকি সতর্কবাণী।

