একটি বিয়ের উৎসব থেকে ফেরার পথে আনন্দঘন মুহূর্তগুলো যে এভাবে কবরের নিস্তব্ধতায় মিশে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। বাগেরহাটের রামপালে গত বুধবারের সেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়নি, বরং পুরো মোংলা শহরকে বিষাদে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর যখন মোংলা পৌর কবরস্থানে পাশাপাশি ৯টি কবরে একই পরিবারের সদস্যদের শায়িত করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখের পানি আর বাতাসের হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ও তার পরিবারের ৮ জন সদস্য। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন নারী ও শিশুও। শুক্রবার দুপুরের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত বিশাল জানাজা শেষে তাদের শেষ বিদায় জানানো হয়। দাফনের আগে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলে দেখা যায়নি।
কাঁপছিল গোরখোদকের হাত, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল জনতা
মোংলা পৌর কবরস্থানের দীর্ঘ ১৭ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন খাদেম ও গোরখোদক মুজিবুর ফকিরের জীবনে এমন দিন আগে কখনো আসেনি। এক সঙ্গে নয়টি কবর খোঁড়ার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। “১৭ বছর ধরে এই কবরস্থানে কাজ করছি, কিন্তু কখনো একই পরিবারের এতগুলো মানুষের জন্য এক সঙ্গে মাটি খুঁড়তে হয়নি। হাত কাঁপছিল আমার,” বলছিলেন মুজিবুর ফকির।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাশাপাশি ৯টি কবর প্রস্তুত করা হয়েছিল। শোকাতুর স্বজনদের চাওয়া ছিল, যারা আজীবন এক সঙ্গে ছিলেন, তারা যেন পরকালেও পাশাপাশি শায়িত থাকেন। ৯টি তাজা প্রাণের বিদায়ি শয্যা তৈরি করতে গিয়ে শুধু গোরখোদক নন, উপস্থিত সাধারণ মানুষের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হয়েছে। কবরস্থানের এক কোণে সারিবদ্ধ এই সমাধিগুলো এখন এক করুণ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল।
বিয়ের উৎসব যখন অন্তহীন বিলাপ
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার রাতে। মোংলার শেওলাবুনিয়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের বিয়ে ছিল খুলনার কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামে। কনের নাম মার্জিয়া আক্তার মিতু। আনন্দ-উল্লাসে বিয়ে সম্পন্ন করে মাইক্রোবাসে করে ফিরছিল বর-কনেসহ পুরো পরিবার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রামপালের বেলাইবিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
মুহূর্তেই দুমড়েমুচড়ে যায় মাইক্রোবাসটি। ঘটনাস্থলেই চালকসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই উৎসবের বাড়ি পরিণত হয় শ্মশানে। আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “রাজ্জাক ভাই তার ছেলের বিয়ের পর নতুন বউকে ঘরে তুলবেন বলে কত আয়োজন করেছিলেন। সবাই খুশিতে ছিলাম। কিন্তু সেই বিয়ের আনন্দই আজ আমাদের পুরো পরিবারকে শ্মশানে পাঠিয়ে দিল।”
শেওলাবুনিয়ায় লাশের মিছিলে বুকফাটা হাহাকার
শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় যখন মরদেহগুলো মোংলার শেওলাবুনিয়ায় পৌঁছায়, তখন মধ্যরাতেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। এলাকাটিতে পিনপতন নীরবতা ভেঙে কেবল কান্নার রোল শোনা যাচ্ছিল। আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছিল নিহত চার নারীর মরদেহ। অন্যদিকে বাকি পাঁচজনের মরদেহ রাখা হয় উপজেলা পরিষদ চত্বরে।
নিহতদের শেষ গোসল ও দাফনের প্রস্তুতির জন্য আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে নয়টি আলাদা খাটিয়া নিয়ে আসা হয়। নিথর দেহগুলো যখন সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছিল, তখন সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো শক্তি যেন কারো ছিল না। একে একে স্বজনদের বিদায় জানানো ছিল এক দুঃসহ যন্ত্রণার। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সহকর্মী—সবার মুখেই ছিল একই বিষাদের ছাপ।
নিয়ম ভাঙা গতির শিকার একটি সাজানো সংসার
বাংলাদেশের সড়কগুলোতে অব্যবস্থাপনা আর গতির প্রতিযোগিতার বলি হওয়ার তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। এই দুর্ঘটনায়ও দেখা গেছে বিপরীত দিক থেকে আসা বাসের বেপরোয়া গতি। মাইক্রোবাসের চালকসহ যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা সবাই ছিলেন সাধারণ নাগরিক, যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি নতুন জীবনের সূচনার। আহাদুর রহমান সাব্বিরের নতুন দাম্পত্য জীবনের বদলে এখন তার পরিবারের সদস্যদের নামের পাশে যোগ হয়েছে ‘প্রয়াত’ শব্দটি।
রামপালের বেলাইবিজ এলাকার এই দুর্ঘটনা আবারও আমাদের সড়ক নিরাপত্তার কঙ্কালসার অবস্থাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা ক্ষণিকের অসতর্কতা কীভাবে কয়েক প্রজন্মের স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে, মোংলার এই শোকাতুর পরিবেশ তারই প্রমাণ। স্থানীয়রা বলছেন, কেবল শোক প্রকাশ করে লাভ নেই; যদি ঘাতক বাসগুলোর বেপরোয়া চলাচলে লাগাম টানা না যায়, তবে এমন নয়টি কবর বারবার খুঁড়তে হবে।
শেষ বিদায়ে অশ্রুসিক্ত হাজারো মানুষ
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নিতে মোংলা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন। জানাজা শেষে মরদেহগুলো যখন কাঁধে করে কবরস্থানের দিকে নেওয়া হচ্ছিল, তখন পুরো শহর যেন থমকে গিয়েছিল। জানাজার ময়দান থেকে শুরু করে দাফনের স্থান পর্যন্ত ছিল শুধু মানুষের ভিড় আর গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ।
বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। তারা বলেন, রাজ্জাক কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের ভরসার জায়গা। তার এমন মৃত্যু অপূরণীয় এক শূন্যতা তৈরি করেছে। নয়টি কবরে যখন মাটি চাপা দেওয়া হচ্ছিল, তখন আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
শোকাতুর মোংলা এবং আগামীর প্রশ্ন
মোংলার এই ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক খবর নয়, এটি সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। বিয়ের কনে মিতুর স্বপ্ন, পরিবারের বড়দের আশীর্বাদ—সবই এখন কবরের নিস্তব্ধতায় মিশে গেছে। এই শোক কাটিয়ে উঠতে পরিবারটিকে কতদিন সংগ্রাম করতে হবে তা কেউ জানে না। যারা বেঁচে আছেন, তাদের কাছে এই স্মৃতি এখন এক বিষাক্ত ক্ষত।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন ও বাস্তবায়নের দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রতিটি লাশের মিছিল আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা আমাদের সড়কগুলোকে নিরাপদ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। মোংলা পৌর কবরস্থানের সেই পাশাপাশি ৯টি কবর যেন এখন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বিবেকের কাছে এক নীরব প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

