এক শোকাবহ ও নৃশংস ঘটনার সাক্ষী হলো কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে তার নিজ কার্যালয়ে ঢুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই একই কক্ষে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক কর্মচারী। বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেল ৪টার দিকে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতির কক্ষে হঠাৎ চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ পাওয়া যায়। কক্ষের ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যান। সেখানে আসমা সাদিয়া রুনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। তার ঠিক পাশেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন ফজলুর রহমান নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী।
খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা কক্ষ থেকে দুজনের নিথর ও রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দায়িত্বরত চিকিৎসকরা সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইমাম হোসাইন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলেই শিক্ষিকার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কর্মচারী ফজলুর রহমানের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার আসমা সাদিয়া রুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ও জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তার আকস্মিক ও এমন ভয়াবহ মৃত্যুতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পরপরই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেন একজন কর্মচারী একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে এমন হামলা চালানোর সুযোগ পেলেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
ইবি থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। ঠিক কী কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং কেনই বা ওই কর্মচারী আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন, তার পেছনের সঠিক কারণ এখনো অস্পষ্ট। প্রাথমিক তদন্তে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। একজন নিরপরাধ শিক্ষকের এমন বিদায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন শিক্ষক সমিতি ও সংশ্লিষ্টরা।
অন্ধকার নেমে আসা ক্যাম্পাসে এখন কেবলই কান্নার রোল আর থমথমে নীরবতা। প্রিয় শিক্ষকের এমন মর্মান্তিক প্রয়াণ মেনে নিতে পারছেন না কেউই। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠছে ছাত্র রাজনীতি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর।

