দেশের টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদে রদবদল সম্পন্ন হয়েছে। দেশের ১৪তম গভর্নর হিসেবে বৃহস্পতিবার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মোস্তাকুর রহমান। তবে যোগদানের প্রথম দিনেই প্রথাগত দীর্ঘ বক্তৃতা বা আশ্বাসের ফুলঝুরি না ছুটিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—আপাতত কথা নয়, তার অগ্রাধিকার থাকবে কেবল কাজে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নতুন গভর্নর। সেখানে তাকে স্বাগত জানান ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে আনুষ্ঠানিকতার ভিড়েও তিনি ছিলেন সংযত। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ছিল, “কথায় নয়, কাজের মধ্য দিয়েই নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাই। এসেছি, কাজ শুরু করি, তারপর কথা বলা যাবে।”
এর আগে সকালে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে যোগদানের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বুধবার বিকেলে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে আগামী ৪ বছরের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয় সরকার। বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে মোস্তাকুর রহমানকে।
১৯৬৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া মোস্তাকুর রহমান পেশাগত জীবনে একজন দক্ষ হিসাববিদ এবং সফল উদ্যোক্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করার পর তিনি আইসিএমএবি থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তবে তার নিয়োগ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে তার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা।
তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠিত বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র একজন সক্রিয় সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জের পরিবেশবান্ধব কারখানা ‘হেরা সোয়েটার্স’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ব্যবসায়ী থেকে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক পদে আসীন হওয়া তার জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও।
বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের আমলে ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা এবং কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, তা প্রশমন করাই হবে নতুন গভর্নরের প্রথম কাজ। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং উপদেষ্টাদের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা মোস্তাকুর রহমানের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়—এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলায় নতুন গভর্নরকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। তার ‘কাজের মাধ্যমে প্রমাণ’ দেওয়ার যে দর্শন, তা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
পেশাদারিত্বের বাইরে রাজনৈতিক ছায়া থাকলেও, একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যক্তিগত খাতের সমস্যাগুলো তার নখদর্পণে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তিনি কীভাবে আর্থিক সংস্কার ত্বরান্বিত করেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশের পুরো আর্থিক খাত।
মোস্তাকুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ এমন এক সময়ে হলো যখন দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের ডাক দিচ্ছে। তার চার বছরের এই মেয়াদকাল দেশের মুদ্রানীতি এবং ব্যাংক খাতের সুশাসনের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে। প্রথম দিনের সেই ‘মৌনতা’ কি কোনো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস নাকি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত, তা সময়ই বলে দেবে।

