একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে লক্ষ্মীপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নেমেছিল। সেই মিছিলে শামিল হয়ে দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে সংসদীয় প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ।
শহীদ মিনার চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে গৃহীত ‘জুলাই সনদ’ কোনো সাধারণ দাপ্তরিক নথিমাত্র নয়। এটি জনআকাঙ্ক্ষার এক প্রতিফলন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক গণভোটে জনগণের রায় যে পথে গেছে, তাতে নতুন করে কোনো আনুষ্ঠানিকতার মারপ্যাঁচে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে যে গণভোট আয়োজিত হয়েছিল, তার ফলাফল এখন সবার সামনে। তিনি উল্লেখ করেন, গণভোটে যেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে, সেখানে সেটি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কার্যকর হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।
এ্যানি চৌধুরীর মতে, জনরায়ের এই শক্তিই হচ্ছে জুলাই সনদের মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, “হ্যাঁ-ভোটের মাধ্যমে জনগণ যা গ্রহণ করেছে, তা কার্যকর করতে আলাদা কোনো শপথ বা আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। এটি অটোমেটিক কার্যকর হবে।” তার এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার সংস্কার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত রাখতে চায়।
তবে যেখানে জনমত ভিন্ন বা যেখানে ‘না’ ভোট পড়েছে, সেই বিষয়গুলোকে অবহেলা করা হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি। মন্ত্রী জানান, যে বিষয়গুলোতে দ্বিমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আইনবিদরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছেন এবং সংসদীয় রীতিনীতি মেনেই সেগুলোর সমাধান সূত্র খোঁজা হবে।
আলোচনার এক পর্যায়ে দেশে ক্রমবর্ধমান ‘মব জাস্টিস’ বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে যে মব কালচার বা জনরোষের অনাকাঙ্ক্ষিত বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তা নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলাই দেশের স্থিতিশীলতার জন্য শুভ নয়।
মন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “মব মানেই একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করা। যারা এই সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে পড়ছেন, তাদের দ্রুত এই পথ থেকে সরে আসা উচিত।” তিনি মনে করেন, একটি দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সবাইকে কাজ করতে হবে। সরকারকে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংস্কার কাজে সহযোগিতা করা এখন সময়ের দাবি। এর বাইরে গিয়ে কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায়, তবে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে।
এ্যানি চৌধুরীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু দেশ গড়ার মৌলিক প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে আসতে হবে। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে, ইতিবাচক গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের মত ও পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সব ইস্যুতেই বিরোধিতা করতে হবে—এমন মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দেশটাকে আন্তরিকতার সঙ্গে গড়ার জন্য কাজ করা দরকার।” জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেন তিনি।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে মন্ত্রীর সঙ্গে জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাহাবুদ্দিন সাবু, যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমানসহ স্থানীয় অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ সময় মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়, আর এখন সময় সেই অর্জিত স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংহত করার।
এ্যানি চৌধুরীর এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তার দেওয়া ‘অটোমেটিক কার্যকর’ হওয়ার তত্ত্ সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের অনমনীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার মাধ্যমেই মন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন।
শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও শোকের আবহ থাকলেও মন্ত্রীর বক্তব্যে আগামীর বাংলাদেশের একটি রূপরেখা ফুটে উঠেছে। যেখানে একদিকে রয়েছে জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, আর অন্যদিকে রয়েছে বিশৃঙ্খলা রুখতে রাষ্ট্রের কঠোর হওয়ার সংকল্প। এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রীর এই আহ্বান মাঠ পর্যায়ে এবং জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।

