সংযম আর ত্যাগের মাস রমজান শুরু হতে না হতেই রাজধানীর বাজারগুলোতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুর। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইফতারের পাতে জনপ্রিয় এই ফলটি কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের প্রিয় ‘জাহিদী’ খেজুর নিয়ে। যে খেজুর বুধবার সকালে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় মিলত, বৃহস্পতিবার তার দাম ঠেকেছে ৩৫০ টাকায়। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় হিসাব করলে দেখা যায়, কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে অন্তত ১০০ টাকা। গত বছর ২৫০ টাকার মধ্যে থাকা ভালো মানের জাহিদী এখন ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও আক্ষেপ
বাজারের এই লাগামহীন পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। মতিঝিল এলাকায় বাজার করতে আসা মোহাম্মদ বিল্লাল আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘সুন্নত মেনে ইফতারে অল্প কিছু খেজুর রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে যদি কেজিতে ৭০-৮০ টাকা বেড়ে যায়, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কপালে খেজুর জুটবে না।’ তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নজরদারির দাবি জানান।
নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ‘বস্তা’ খেজুরের দামও স্থিতিশীল নেই। দুদিন আগেও যা ২২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে ছিল, তা এখন ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছর এই একই খেজুর ১৮০ থেকে ২২০ টাকার মধ্যে কিনতে পেরেছিলেন ভোক্তারা।
অভিজাত খেজুরের দরদাম
কেবল সাধারণ মানের খেজুর নয়, দাম বেড়েছে প্রিমিয়াম ও আমদানিকৃত উচ্চমানের খেজুরেরও। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী: সুরমা ও বরই: কেজিপ্রতি ৩৬০ থেকে ৬৫০ টাকা। দাবাস ও সুদাই: ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। মরিয়ম (কালমি ও মাবরুম): ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা। আজওয়া: ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকা। মেডজুল: ১৬৫০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হচ্ছে।
সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবুও কেন এই বৃদ্ধি?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, দেশে খেজুরের কোনো সংকট নেই। বছরে দেশে খেজুরের চাহিদা ১ লাখ টনের কাছাকাছি, যার সিংহভাগই লাগে এই রমজানে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি খেজুর মজুত রয়েছে। সরকার আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করায় আমদানিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
তাহলে দাম বাড়ছে কেন? সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দাম বাড়াতে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকটের গুঞ্জন ছড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের কাছে সাগরে বাংলাদেশমুখী ১৫০ কনটেইনার খেজুর ডুবে যাওয়ার একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এই ঘটনাকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাজার মনিটরিং ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকার পরেও দাম বাড়াটা সরাসরি বাজার কারসাজির লক্ষণ। রোজার প্রথম দিনেই যদি দামের এই দশা হয়, তবে মাসজুড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর অবস্থানে না যায়, তবে এই কৃত্রিম সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফালোভী মানসিকতা পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন ভোক্তারা। একই সাথে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত বাজার তদারকির দাবি উঠেছে সর্বস্তর থেকে।

