অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং সেটির তথ্য গোপন করার অভিযোগে বাংলাদেশের সাবেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ড. প্রশান্ত কুমার রায়-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একটি সংবেদনশীল ও পেশাদার তদন্তের পর দেশের প্রধান দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে গতকাল, বুধবার (০৩ ডিসেম্বর) অভিযোগপত্র অনুমোদনের এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সংস্থাটির জনসংযোগ দপ্তর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এই অনুমোদন সরকারি উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের আর্থিক অসঙ্গতি খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে দুদকের চলমান কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।
সাবেক এই সচিবের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৫ জুন উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান কর্তৃক মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার পর, উপ-পরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম, যিনি মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন, তার প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন অভিযোগপত্র দাখিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
তদন্তকারী সংস্থা দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ড. প্রশান্ত কুমার রায় তাঁর কর্মজীবনে ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যে সুনির্দিষ্ট আর্থিক অসঙ্গতিগুলো আনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো:
সম্পদের তথ্য গোপন: ড. প্রশান্ত কুমার রায় তাঁর সম্পদ বিবরণীতে মোট ১ কোটি ২০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৫১ টাকা মূল্যমানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন: বৈধ আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তিনি প্রায় ৭৭ লাখ ৫১ হাজার টাকার অবৈধ বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন, যা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুদকের অনুসন্ধানে সাবেক সচিবের এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবগুলোতেও বড় ধরনের সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের চিত্র পাওয়া গেছে। সংস্থাটির মতে:
ড. প্রশান্ত কুমার রায় তাঁর নিজ নামে ও মেয়েদের নামে খোলা মোট ১২টি ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন করেছেন।
এই ১২টি হিসাবে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৯ টাকা।
দুদক এই বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে এবং এটি অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
ড. প্রশান্ত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য কমিশন যে সকল আইনগত ধারার অনুমোদন দিয়েছে, তা নিম্নরূপ:
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ২৬(২): এটি মিথ্যা বা ভুল সম্পদ বিবরণী দাখিল, অথবা জ্ঞাতসারে সম্পদের তথ্য গোপন করার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ২৭(১): এটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন বা ভোগদখলে রাখার অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ধারা ৪(২) ও ৪(৩): এই ধারাগুলো সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত অপরাধের জন্য প্রযোজ্য।
এই অভিযোগপত্রের অনুমোদন দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন অভিযোগপত্রটি দ্রুতই সংশ্লিষ্ট আদালতে দাখিল করা হবে। আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়ার পর এর ভিত্তিতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। এই ঘটনা বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অঙ্গীকারকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করে। সাবেক সচিবের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির এই ধরনের মামলাগুলোর ওপর নজর রাখে, কেননা এগুলো দেশের সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।

