ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ এক বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা এলাকা। সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে ককটেল তৈরির সময় অসাবধানতাবশত এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন দুইজন। গুরুতর আহত অবস্থায় আরও তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার ভোরে ঘটা এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামে মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের বাড়িতে এই বিস্ফোরণ ঘটে। একদল দুষ্কৃতকারী সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী ককটেল তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে অবস্থান করছিল। কাজ চলাকালীন আকস্মিক বিস্ফোরণে মুহূর্তেই ঘরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, নিহত দুই ব্যক্তির মরদেহ চেনার উপায় নেই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিহতদের হাতের কব্জি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মুখমণ্ডল পুড়ে সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গেছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ এলাকাটি কর্ডন করে রাখে। পরবর্তীতে আলামত সংগ্রহের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে।
বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক আলামত দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে সেখানে ককটেল তৈরির কাজ চলছিল। এক বা একাধিক ককটেল একসাথে বিস্ফোরিত হওয়ায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও জানান, নিহতরা সম্ভবত ওই এলাকারই বাসিন্দা, তবে পরিচয় নিশ্চিত হতে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ অন্যান্য আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
ঘটনায় আহত তিনজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের শরীরের বিভিন্ন অংশ দগ্ধ ও জখম হয়েছে।
এই ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেন, “অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। অপরাধী কেবলই একজন অপরাধী। আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।”
পুলিশের ধারণা, কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যেই নির্জন এই বাড়িতে ককটেল তৈরির মজুদ গড়ে তোলা হয়েছিল। বাড়ির মালিক মো. কালামের ভূমিকা এবং এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। রাজশাহী থেকে একটি বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটও ঘটনাস্থলের পথে রয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে পুরো গ্রামজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে যাতে এ ধরনের আরও কোনো বিস্ফোরক বা দুষ্কৃতকারী লুকিয়ে থাকতে না পারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।

