সারাদেশ যখন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলের শান্ত পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠল নির্বাচনী সহিংসতায়। ভোটের আগের রাতে প্রচারণার সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে সদর উপজেলার শিলই ইউনিয়নের পূর্ব রাকিকান্দি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
নির্বাচন কমিশনের কড়া নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকেই সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ। গ্রামজুড়ে যখন নির্বাচনী নীরবতা বিরাজ করছিল, তখনই পূর্ব রাকিকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ চিৎকার ও হট্টগোল শুরু হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে লড়ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান রতন। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার বিকেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের কয়েকজন সমর্থক পূর্ব রাকিকান্দি স্কুল মাঠে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যার আগমুহূর্তে হঠাৎ করেই প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ওপর চড়াও হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। লোহার রড, লাঠি ও ডাসা দিয়ে চালানো এই হামলায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর চারজন কর্মী রক্তাক্ত জখম হন।
আহতরা হলেন—পূর্ব রাকিকান্দি গ্রামের ইকবাল হোসেন (৩৮), মো. জয় (২৮), জুয়েল শেখ (৪০) এবং আব্দুল জব্বার (৫৩)। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনার পর থেকে গ্রামটিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক।
হামলার সূত্রপাত সম্পর্কে আহতদের একজন, জয় ব্যাপারী গণমাধ্যমকে বলেন, “নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী প্রচারণার সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে বিএনপির সমর্থকরা একটি মিছিল নিয়ে কেন্দ্রের সামনে আসে। আমরা তাদের মিছিল করতে নিষেধ করি এবং আইনের কথা মনে করিয়ে দেই। এতেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কোনো কথা না বলেই তারা লোহার রড ও লাঠি নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।”
অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া সদর উপজেলা যুবদলের সদ্য বহিষ্কৃত সদস্য সচিব সোহাগ অভিযোগের তীর ছুড়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা জাকির হোসেন জমাদ্দারের দিকে। তিনি বলেন, “আমরা মাত্র ৪-৫ জন সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। হঠাৎ জাকির হোসেনের নেতৃত্বে ধানের শীষের ৩০ থেকে ৪০ জন লোক এসে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা আমাদের কর্মীদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে।”
তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জাকির হোসেন জমাদ্দার। তিনি পাল্টা দাবি করেন, ঘটনাটি একপাক্ষিক ছিল না। তিনি বলেন, “আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাই এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলেই প্রতিপক্ষ আমার নাম জড়ায়। মূলত দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে ধস্তাধস্তি হয়েছে এবং এতে উভয় পক্ষেরই কয়েকজন আহত হয়েছে। আমাকে অযথা দোষারোপ করা হচ্ছে।”
মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চল বরাবরই নির্বাচনী রাজনীতির জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত। ভোটের আগের রাতে এমন ঘটনা প্রশাসনের জন্যও বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় মুন্সীগঞ্জ সদর থানা পুলিশ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মুন্সীগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা সংঘর্ষের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং স্বাভাবিক আছে। আমরা শুনেছি উভয় পক্ষের ৫-৬ জন আহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভোটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মনে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। আগামীকাল সকাল থেকেই শুরু হবে ভোটগ্রহণ। প্রশাসন আশ্বস্ত করছে যে, ভোটকেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং কেউ যাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে তাদের কড়া নজরদারি রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, চরাঞ্চলের এই উত্তাপ ভোটের বাক্সে কোনো প্রভাব ফেলে কি না।

