আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টানা চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করায় রাজধানী ছাড়ছে লাখো মানুষ। এর ফলে শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের ওপর দিয়ে যাওয়া দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক স্থবির হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের আনন্দযাত্রাকে বিষাদে পরিণত করেছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মহাসড়কের টঙ্গী কলেজ গেট থেকে মাওনা চৌরাস্তা এবং ভোগড়া বাইপাস থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পর্যন্ত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। সোমবার বিকেলের পর থেকে শিল্প-কারখানাগুলো ছুটি হয়ে যাওয়ায় ঘরমুখী মানুষের চাপ বাড়ে। উত্তরবঙ্গের ২৬ জেলার প্রবেশপথ চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় রাত থেকেই শুরু হওয়া এই বিশৃঙ্খলা মঙ্গলবার সকালেও চরম আকার ধারণ করে।
ভাড়ার নৈরাজ্য: তিনগুণ বেশি আদায়ের অভিযোগ
মহাসড়কে যানবাহনের সংকটের সুযোগ নিয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীদের দাবি, সাধারণ সময়ের ৫০০ টাকার ভাড়া এখন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। এই ভাড়ার নৈরাজ্য সইতে না পেরে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা ও মাওনা এলাকায় বেশ কিছু সময় সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান।
আশা বেগম নামে এক পোশাক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোট দিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য বের হয়েছি, কিন্তু রাস্তায় এক নরক যন্ত্রণায় পড়লাম। কোনো বাসই ন্যায্য ভাড়া নিচ্ছে না। ৬০০ টাকার ভাড়া চাচ্ছে ১৫০০ টাকা। এখানে তদারকি করার কেউ নেই।” একই পরিস্থিতির কথা জানান চালকরাও। সাভার থেকে কালিয়াকৈর আসতে যেখানে আধা ঘণ্টা সময় লাগার কথা, সেখানে সারা রাত পার হয়ে সকাল হয়ে গেছে বলে জানান শ্যামলী এন আর পরিবহনের এক চালক।
ট্রাক ও পিকআপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা
বাসে জায়গা না পেয়ে এবং অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে অনেক যাত্রীকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান এমনকি খোলা ট্রলিতে করে গন্তব্যে রওনা হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিয়ে এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা করা চরম মানবেতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানজটের কারণে অনেক পরিবহন মহাসড়কের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকায় অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহনগুলোও আটকা পড়েছে।
গাজীপুরের পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকেই ট্রাফিক জ্যাম সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মাঠে কাজ করছেন। বিশেষ করে চন্দ্রা বাস টার্মিনাল, ভোগড়া বাইপাস এবং কালিয়াকৈর এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক যাত্রী ও যানবাহনের চাপের তুলনায় রাস্তা সরু থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
প্রশাসনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাউগাতুল আলম জানান, শিল্প-কারখানাগুলো একসাথে ছুটি হওয়ার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, “মহাসড়ক স্বাভাবিক রাখতে আমাদের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। ভাড়ার বিষয়টিও আমাদের নজরে এসেছে। যারা সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
নির্বাচনের আমেজের মাঝে এমন যানজট ও ভাড়ার নৈরাজ্য জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার আশ্বাস থাকলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। আজ সারাদিন এই চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, তেমনি জনভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে।

