ব্রহ্মপুত্রের তীরে আজ যেন জনসমুদ্র নেমেছিল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদের শেষ নির্বাচনী মিছিলে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব গণজোয়ার। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রাজপথ আর ধানের শীষের পোস্টারে ঢাকা ময়মনসিংহ নগরী আজ এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সোমবার সন্ধ্যায় ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান বিএনপির কেন্দ্রীয় এই নেতা। আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, “এই নির্বাচন কেবল একজন ব্যক্তির জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, বরং এটি পুরো জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের সংগ্রাম। বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হোন এবং ধানের শীষে ভোট দিয়ে তারেক রহমানকে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে সহযোগিতা করুন।”
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিহিংসামুক্ত আগামীর প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কোনো ধরনের প্রতিশোধের রাজনীতিতে জড়াবে না, বরং সবাইকে সাথে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলবে। তার এই বক্তব্য সমাবেশে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, ১২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের প্রশাসন একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ঈমানি দায়িত্ব পালন করবে। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক বাধ্যবাধকতা।”
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সদরবাসীর সেবা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এই প্রার্থী বলেন, ময়মনসিংহ সদর আসন দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। অবহেলিত এই জনপদকে আধুনিক ও স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ধানের শীষের বিকল্প নেই। তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন কোনো ভয়ভীতির কাছে নতি স্বীকার না করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে শামিল হন।
সমাবেশ শেষে শুরু হয় প্রচার মিছিল। সার্কিট হাউজ মাঠ থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ টাউন হল, জিলা স্কুল মোড় এবং নতুন বাজার এলাকা প্রদক্ষিণ করে। চরপাড়া মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় মিছিলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। হাজার হাজার মানুষের এই মিছিলটি পলিটেকনিক মাঠে গিয়ে এক সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়।
এর আগে দুপুর থেকেই ময়মনসিংহের ৩৩টি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার ৯৯টি ওয়ার্ড থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল আসতে শুরু করে। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আর “ধানের শীষ” স্লোগানে পুরো শহর এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। রিকশা চালক থেকে শুরু করে শিক্ষক, আইনজীবী ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই আসনে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
মিছিলে আবু ওয়াহাব আকন্দের সাথে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকনসহ অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। নেতৃবৃন্দরা দাবি করেন, সুষ্ঠু ভোট হলে ময়মনসিংহে ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত।
নগরীর চরপাড়া মোড়ে কথা হয় এক প্রবীণ ভোটারের সাথে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু শান্তি চাই আর নিজের ভোটটা নিজে দিতে চাই। আজকের এই জনস্রোত বলে দিচ্ছে মানুষ পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে।” ময়মনসিংহের রাজপথে আজকের এই শক্তি প্রদর্শন প্রতিপক্ষ শিবিরকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
সদর আসনের এই নির্বাচনী আবহাওয়া এখন তুঙ্গে। শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি। প্রশাসন জানিয়েছে, ভোটের দিন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। আবু ওয়াহাব আকন্দের এই শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সংহতি প্রকাশের পর এখন দেখার বিষয়, ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে ময়মনসিংহের মানুষ কার গলায় জয়ের মালা পরায়।

