ফেব্রুয়ারির বাতাসে এখন ফাগুনের গন্ধ। চারদিকে নির্বাচনী প্রচারণার রঙ আর শ্লোগানে মুখরিত রাজপথ। বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ রংপুর বিভাগজুড়ে এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাজ সাজ রব। কিন্তু এই নির্বাচনী বসন্তের কোনো রঙ স্পর্শ করেনি চল্লিশ ছুঁইছুঁই শাহিন আখতারের জীবনকে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ইসবপুর গ্রামের এই বাসিন্দা একজন হিজড়া। তার বাড়ির সামনে দিয়ে প্রতিদিন প্রার্থীরা মিছিল নিয়ে যাচ্ছেন, মাইকিং হচ্ছে, অথচ কেউ একবারের জন্য তার দুয়ারে কড়া নেড়ে ভোটটুকু চায়নি।
শাহিনের এই আক্ষেপ কেবল তার একার নয়; বরং রংপুর বিভাগের আট জেলার ১৩১ জন নিবন্ধিত হিজড়া ভোটারের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। তাদের কাছে নির্বাচন মানে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং এক টুকরো সম্মানের প্রত্যাশা। শাহিন বলেন, “সবাই আমাদের আড়চোখে দেখে। সরকারও ঠিকমতো মূল্যায়ন করে না। ভোট দেওয়ার অধিকার আছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের মর্যাদা কোথায়?”
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে এবার ২৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু এই বিশাল নির্বাচনী যজ্ঞে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি নেই বললেই চলে। ঢাকা পোস্টের সাথে আলাপকালে কুড়িগ্রাম তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি পাখি আক্তার জানান, তারা সমাজে আজও অবহেলিত। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেন তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেন, এটাই তাদের বড় চাওয়া।
বাস্তবতা হলো, ২০১৩ সালে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলেও আইনগত জটিলতায় তারা আজও পিষ্ট। নীলফামারীর নাহিদ ইসলাম এর আগে কয়েকবার ভোট দিয়েছেন। তবে তার আক্ষেপ, “খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা আর চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার পেতেও আমাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। ভোট দিতে যাব ঠিকই, কিন্তু ভয় হয়—শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়ে ফিরতে পারব তো?”
হিজড়া জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো নিজেদের পরিচয়ে ভোটার হতে ভয় পায়। এর পেছনে রয়েছে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে আইনি অস্পষ্টতা। প্রচলিত আইনে ছেলে বা মেয়ের সম্পত্তির হিসেব থাকলেও তৃতীয় লিঙ্গের বিষয়টি অমীমাংসিত। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে নারী বা পুরুষ পরিচয়ে ভোটার হচ্ছেন। কুড়িগ্রামের কবির হোসেন মাহি আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা তো সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আজও আমরা ব্রাত্য।”
এবারের নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে নেমে চমক দেখিয়েছিলেন হিজড়া নেত্রী আনোয়ারা ইসলাম রানী। গত ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার প্রচারণার শেষ মুহূর্তে তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন। তার লড়াই এখন সংসদীয় সংরক্ষিত আসনের দাবিতে। রানীর মতে, হিজড়াদের ‘পিছিয়ে পড়া’ নয় বরং ‘পিছিয়ে রাখা’ হয়েছে। সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধিত্ব না থাকলে তাদের কণ্ঠস্বর পৌঁছাবে না নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গীকার না থাকলেও ব্যতিক্রম শুধু একটি দল। মিঠাপুকুরের আলোচিত জনপ্রতিনিধি মারুফা আক্তার মিতু জানান, জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে হিজড়াদের পুনর্বাসন ও চাকরির কোটার কথা উল্লেখ করেছে। তবে বড় দলগুলোর উদাসীনতা তাদের হতাশ করেছে। তারা চান এমন একটি সরকার, যারা তাদের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে সরিয়ে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
রংপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্যমতে, কেবল রংপুর জেলাতেই প্রায় চারশ হিজড়া রয়েছেন। কিন্তু ভোটার হিসেবে তালিকায় নাম এসেছে মাত্র ৩১ জনের। এই বিশাল ব্যবধানই বলে দেয় মূলধারার সাথে তাদের দূরত্বের কথা। আবাসন সংকট, চিকিৎসার অভাব আর আইনি সুরক্ষা না থাকায় অধিকাংশ হিজড়া মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
শহীদ হোসেন শ্রাবণ নামের এক হিজড়া সদস্য বলেন, “নারীদের জন্য সুরক্ষামূলক আইন থাকলেও আমাদের ওপর কোনো অপরাধ হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই নতুন সরকার আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করুক।”
আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত এই সাধারণ নির্বাচন। রংপুর বিভাগের ১ কোটি ৩৩ লাখ ভোটারের ভিড়ে ১৩১ জন হিজড়া ভোটারের সংখ্যাটি হয়তো নগণ্য। কিন্তু তাদের নাগরিক অধিকারের দাবিটি আজ অনেক বেশি জোরালো। ভোটের মাঠে উৎসবের রঙ কতটুকু তাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে আগামীর ব্যালট বাক্সে।

