খুলনার রাজনৈতিক ময়দান এখন নির্বাচনী উত্তাপে উত্তাল। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে জনতা আর প্রশাসনের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। শনিবার বিকেলে খুলনা-৫ আসনের ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সমর্থনে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি বর্তমান পরিস্থিতির এক তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
হাসনাত আবদুল্লাহর ভাষায়, এই লড়াই এখন আর কেবল প্রার্থীর নয়, বরং নীতির। তিনি বলেন, “আমরা ১২ তারিখের জন্য ব্যালটের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু একটি পক্ষ নিচ্ছে বুলেটের প্রস্তুতি। তবে তারা ভুলে গেছে যে, জনতার ব্যালট বিপ্লবের সামনে কোনো বুলেটই টেকেনি, আর টিকবেও না।” তার এই মন্তব্যে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট মনে করিয়ে দেন। হাসনাত জানান, এই ভোটাধিকার ফিরে পেতে ইউক্রেন বা অন্য কোনো দূরদেশের গল্প নয়, খোদ বাংলাদেশের মাটিতেই অসংখ্য মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। “হাসিনা সারা দেশকে একটা উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করেছিলেন। আয়নাঘরের বিভীষিকা আমরা ভুলে যাইনি। লগি-বৈঠার তান্ডব থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক শহীদ ওসমান হাদির আত্মত্যাগ—এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল হচ্ছে আজকের এই নির্বাচন,” যোগ করেন তিনি।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এবার আর রাখঢাক করেননি এই ছাত্রনেতা। বিগত তিনটি নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অতীতে দিনের ভোট রাতে হয়েছে, এমনকি মৃত মানুষের নামেও ভোট দেওয়ার কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তার আবেগঘন বার্তা ছিল, “যদি অবৈধ টাকার প্রলোভন সামনে আসে, তবে নিজের সন্তান আর দেশের মানুষের চেহারার দিকে তাকান। শহীদদের রক্তে অর্জিত এই নির্বাচনে যদি আবার ব্যালট বাক্স ভরাটের চেষ্টা হয়, তবে জনতার যে বিদ্রোহ শুরু হবে, তা সামলানো কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।”
হাসনাত আবদুল্লাহর নিশানায় ছিল গণমাধ্যমের একটি অংশও। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, কিছু ‘মিডিয়া মাফিয়া’ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দালালি করছে। তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা সত্য বলতে চাইলেও মালিকপক্ষের চাপে তা পারেন না। কিন্তু মনে রাখবেন, যখন সাধারণ মানুষ জেগে ওঠে, তখন কোনো টিভির প্রয়োজন হয় না। জনগণই তখন সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।” বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে দালালি করলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
খুলনার ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার ভোটারদের সতর্ক করে তিনি কালো টাকার প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় ‘টাকার বস্তা’ নিয়ে নামা একটি পক্ষের কথা উল্লেখ করে তিনি ভোটারদের প্রশ্ন করেন, “ভোটের আগের এক রাতে টাকা নিয়ে পাঁচ বছর গোলাম হয়ে থাকবেন, নাকি সম্মানের সাথে ভোট দিয়ে পাঁচ বছর সেবা নেবেন? ভোট বিক্রি করা মানে নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেওয়া।”
নির্বাচনী ময়দানে বিএনপির মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রতিও তিনি ঐক্যের ডাক দেন। দলের ভেতরে থাকা চাঁদাবাজ ও সুযোগসন্ধানীদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যারা জিয়ার আদর্শে বিশ্বাস করেন, বেগম খালেদা জিয়ার লড়াইকে শ্রদ্ধা করেন, তাদের জন্য আমাদের দরজা খোলা। আসুন, একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।”
ফুলতলা উপজেলা আমির অধ্যাপক আব্দুল আলিম মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জোটের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভায় জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগরীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা প্রত্যেকেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানান এবং ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্য খুলনার রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্যালটের মাধ্যমে বুলেটের জবাব দেওয়ার যে ডাক তিনি দিয়েছেন, তা শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

