জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের সেই ধূসর রেখাটা আজ চিরতরে মুছে গেল। দীর্ঘ ২৭ দিন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করে হার মানল ১২ বছর বয়সী শিশু হুজাইফা আফনান। শনিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে। মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা একটি অভিশপ্ত বুলেট কেড়ে নিল প্রাণোচ্ছল এক শৈশব।
হুজাইফার মৃত্যু সংবাদটি নিশ্চিত করে তার চাচা শওকত আলী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, চিকিৎসকরা সকালে তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। এখন নিথর দেহটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুটি এভাবে সীমান্তের ওপার থেকে আসা লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে প্রাণ হারাবে, তা মানতে পারছে না পরিবার কিংবা এলাকাবাসী।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হুজাইফার মস্তিষ্কে বিদ্ধ হওয়া গুলিটি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। অস্ত্রোপচার করা হলেও জটিলতা ও জীবনের ঝুঁকি থাকায় চিকিৎসকরা গুলিটি বের করতে পারেননি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু জানান, মাঝে হুজাইফার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, এমনকি তাকে ভেন্টিলেটর থেকেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ (সেপসিস) ছড়িয়ে পড়ে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে কোনো ওষুধই আর কাজ করেনি, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হুজাইফার এই করুণ পরিণতির শুরু গত ১১ জানুয়ারি। সেদিন সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় নিজের বাড়ির কাছেই মিয়ানমারের ওপার থেকে আসা গুলিতে গুরুতর আহত হয় সে। স্থানীয় জসিম উদ্দিনের মেয়ে হুজাইফাকে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৩ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত কয়েক মাস ধরে জান্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। ড্রোন হামলা, বিমান হামলা আর মর্টার শেলের শব্দে নিয়মিত কেঁপে উঠছে বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত। ওপারের এই যুদ্ধের আগুনের ফুলকি প্রায়ই আছড়ে পড়ছে এপারের জনপদে। কখনো চিংড়িঘের, কখনো বসতবাড়ি কিংবা নাফ নদীতে এসে পড়ছে গুলি ও গোলা। হুজাইফার মৃত্যু সেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির এক করুণ সাক্ষী হয়ে রইল।
শিশুটির মৃত্যুতে টেকনাফের সীমান্ত এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, এটি সীমান্তের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন। তারা অবিলম্বে সীমান্তে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আরও জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও হুজাইফার মৃত্যু গভীর রেখাপাত করেছে। কক্সবাজার-৪ আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরাও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। হুজাইফার এই অকাল প্রয়াণ সীমান্তের নিরপরাধ মানুষের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে। ছোটবেলায় যার হেসেখেলে বেড়ানোর কথা ছিল, আজ তার গন্তব্য হবে অন্ধকার কবরস্থানে—এই সত্যটিই যেন মেনে নিতে পারছে না টেকনাফবাসী।

