উত্তর জনপদের শান্ত শহর ঠাকুরগাঁও। শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ী বাজার থেকে সামান্য দূরত্বে এগোলেই চোখে পড়বে একটি সাদামাটা পৈতৃক বাড়ি। এই বাড়ির মানুষটিই আজ দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র। তবে স্থানীয়দের কাছে তিনি কোনো বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব বা সাবেক মন্ত্রী নন; তিনি স্রেফ ‘স্যার’। শিক্ষকতা দিয়ে জীবন শুরু করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আজও ভালোবেসে এই নামেই ডাকেন এলাকার আবালবৃদ্ধবনিতা। সেই চিরচেনা মানুষটিই এবার ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে চষে বেড়াচ্ছেন গ্রামের পর গ্রাম।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে বইছে ভিন্ন হাওয়া। তবে বয়সের ভার আর শারীরিক ক্লান্তি থাকলেও মির্জা ফখরুলের প্রচারণায় কোনো আলস্য নেই। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। বসার ঘরে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নির্বাচনী রণকৌশল আর পোলিং এজেন্টদের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। এবার তার প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তার বড় মেয়ে, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড. শামারুহ মির্জা। বাবার জন্য ভোট চাইতে তিনিও ছুটে চলছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।
‘এটাই আমার জীবনের শেষ নির্বাচন’
নির্বাচনী পথসভাগুলোতে মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে ঝরছে আবেগ। কিসমত দৌলতপুর থেকে শুরু করে বেগুনবাড়ীর নিভৃত গ্রাম—সবখানেই তিনি ভোটারদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন ৩৫ বছরের পুরোনো সম্পর্কের কথা। বশভাংগা গ্রামের এক সভায় তিনি অকপটে বলেন, “আমি নতুন কেউ নই। আপনাদের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলাম, অনেকেই আমার ছাত্র। এবারই সম্ভবত আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। তাই আপনাদের কাছে শেষবারের মতো দোয়া ও সমর্থন চাইছি।”
তিনি ভোটারদের আশ্বস্ত করেন যে, এবারের নির্বাচনে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই। একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুন্দর ভোট হবে বলে তিনি আশাবাদী। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
হিন্দু সম্প্রদায়ের উলুধ্বনি ও মাটির ব্যাংকের মমতা
বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের বশভাংগা গ্রামে পৌঁছালে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানকার সনাতন ধর্মাবলম্বী বাসিন্দারা ফুল ও উলুধ্বনি দিয়ে তাদের প্রিয় ‘স্যার’কে বরণ করে নেন। মির্জা ফখরুল তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আপনারা নির্ভয়ে ভোট দিতে যাবেন। আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের। আমরা ক্ষমতায় এলে এলাকার মন্দির উন্নয়ন ও রাস্তাঘাট পাকাকরণের কাজ দ্রুত শেষ করব।”
মন্ডলপাড়া গ্রামে ঘটে আরও এক আবেগঘন ঘটনা। মোছা. চামেলি নামে এক সাধারণ নারী ভোটার তার জমানো মাটির ব্যাংকটি মির্জা ফখরুলের হাতে তুলে দেন নির্বাচনী খরচ হিসেবে। অভাবী মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিএনপির এই বর্ষীয়ান নেতা। তিনি বারবার বলছিলেন, সাধারণ মানুষের এই আস্থাই তার রাজনীতির বড় শক্তি।
কৃষকের প্রত্যাশা ও স্থানীয় বাস্তবতা
ঠাকুরগাঁও মূলত কৃষিপ্রধান এলাকা। এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের মতে, চিনিকল আর কয়েকটি রাইস মিল ছাড়া এখানে কর্মসংস্থানের বড় কোনো উৎস নেই। ফলে শিক্ষিত যুবকরা বেকার হয়ে পড়ছে। ভোটারদের প্রত্যাশা, মির্জা ফখরুল জয়ী হলে এই অঞ্চলে বড় ধরনের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পায়ের ব্যথায় লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে হয় বৃদ্ধা জুলেখা বেগমকে। তিনি এসেছেন তার প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে। জুলেখার ভাষায়, “স্যার একখান বড় নেতা। তিনি জিতিবা পারিলে হামার এলাকাত অনেক কাজ হইবে।” এই সাধারণ মানুষের বিশ্বাসই এখন মির্জা ফখরুলের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মূল হাতিয়ার।
শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা
দিনভর কহরপাড়া, দানারহাট ও বিভিন্ন স্থানে পথসভা শেষে সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও শহরে একাধিক মতবিনিময় সভায় যোগ দেন তিনি। মির্জা ফখরুল জানান, ভোটারদের কাছ থেকে তিনি অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছেন। তার মতে, এবারের লড়াই কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের নয়, বরং মানুষের হারানো ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই।
রাত গভীর হলেও মির্জা ফখরুলের বাড়ির উঠানে নেতা-কর্মীদের ভিড় কমছে না। একদিকে ভোটারদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে রাজনৈতিক জীবনের শেষ লড়াই—সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই নির্বাচন এখন সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রে।

