আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। এই ভোটকে কেবল একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, বরং পুরোনো ও কলুষিত রাজনীতিকে বিদায় জানানোর মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অর্থ হলো বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো।
বিকেল ৪টার দিকে জনসভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ১২ তারিখের গণভোট হবে গত কয়েক দশকের খুনের রাজনীতি, আয়নাঘর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখান করার দিন। হাজারো নেতাকর্মীর করতালির মধ্যে তিনি ঘোষণা করেন, যারা দেশপ্রেমিক নেতাদের হত্যা করেছে এবং জনগণের হক নষ্ট করেছে, এই ১২ তারিখ তাদের রাজনীতিকে জনগণ ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন করবে।
‘দুই ধরনের উন্নয়ন’ ও দুর্নীতির সমালোচনা
রাজশাহীর উন্নয়ন নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে জামায়াত আমির একটি ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে দেশে মূলত দুই ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। একদিকে কিছু রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ বা অবকাঠামো তৈরি হয়েছে সত্য, কিন্তু তার সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির পাহাড়।
তার মতে, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার বাজার লুট আর সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ নিজেদের ভাগ্য গড়েছে। বিদেশের মাটিতে দেশের টাকা পাচার করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তাকেই তিনি বিগত সময়ের ‘আসল উন্নয়ন’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জনগণের ক্ষমতায়ন হলে এই লুটপাটের রাজনীতির কবর রচনা করা হবে।
বিভাজন নয়, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “১১ দলীয় জোটের মূল স্লোগানই হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা সাঁওতাল—কাউকেই আলাদা করে দেখতে চাই না।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, জাতিতে জাতিতে হিংসা ও বিভাজন তৈরি করে যারা ফায়দা লুটতে চায়, তাদের আর সুযোগ দেওয়া হবে না।
আল্লাহর দেওয়া বিধানের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য খোদাপ্রদত্ত আইনের বিকল্প নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, এই বিধান কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার গ্যারান্টি দেয়। যেখানে নারীরা নির্ভয়ে পথ চলবে এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পূর্ণ মর্যাদা ভোগ করবে।
পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির সমাপ্তি
বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের আভাস দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, “এই দেশে আর রাজার ছেলে রাজা হবে—এমন নিয়ম চলবে না।” বংশপরম্পরায় চলে আসা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে মেধা, যোগ্যতা এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের বিষয়ে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, কারো আধিপত্য মেনে নিয়ে নয়, বরং সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে সারা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে তার দল। বাংলাদেশের মানুষ কারো কাছে মাথা নত করে নয়, বরং বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই তাদের লক্ষ্য।
দেশজুড়ে ব্যস্ত নির্বাচনী সফর
রাজশাহীর এই জনসভাটি ছিল ডা. শফিকুর রহমানের দিনব্যাপী ঝটিকা সফরের অংশ। এর আগে তিনি নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং গোদাগাড়ীতে পৃথক নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করেন। রাজশাহীর কর্মসূচি শেষ করে সন্ধ্যায় তিনি নাটোরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
রাজশাহী মহানগর ও জেলা জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এই জনসভাটি আগামী সপ্তাহের গণভোটের আগে উত্তরবঙ্গে দলটির শক্তির এক বড় মহড়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, জামায়াত আমিরের এই ‘লাল কার্ড’ তত্ত্ব তৃণমূলের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

