মাঘের হাড়কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে উত্তরবঙ্গের জনপদ যখন থমকে ছিল, ঠিক তখনই তিস্তাপাড়ের হাতীবান্ধায় নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়; এটি গত ৫৪ বছর ধরে জনগণের সাথে প্রতারণা করা শক্তির বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত রায়।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এই নির্বাচন দুর্নীতিবাজদের লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন। যারা দেশের সম্পদ লুটে খেয়েছে, এবার তাদের বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে।” জামায়াত আমিরের এই কঠোর অবস্থান এবং সরাসরি ‘লাল কার্ড’ দেখানোর হুঁশিয়ারি উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তার বক্তব্যে এক ধরণের আপসহীন সুর ফুটে ওঠে, যা সমসাময়িক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘পেট থেকে চুরির মাল বের করা হবে’: দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান যে অত্যন্ত কঠোর হবে, তার এক নজিরবিহীন উপমা দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করা হবে না। প্রয়োজনে মুখ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে পেট থেকে চুরির মাল বের করে আনা হবে।” তার এই আক্রমণাত্মক অথচ স্পষ্ট বার্তাটি মূলত দেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থার প্রতি এক চরম অনাস্থার প্রতিফলন।
তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে কিছুটা আক্রমণাত্মক সুরেই বলেন যে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিক্রমার পর তাদের এখন কিছুটা ‘বিশ্রাম’ নেওয়া প্রয়োজন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতকেই যোগ্য বিকল্প হিসেবে দাবি করে তিনি বলেন, এবার দেশের সেবায় নতুন শক্তিকে সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন যে, আসন্ন নির্বাচনে তার দল কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, বরং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই মাঠে থাকছে।
উত্তরবঙ্গের বঞ্চনা ও ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’
বক্তব্যে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বৈষম্যের বিষয়টি অত্যন্ত আবেগঘনভাবে তুলে ধরেন আমিরে জামায়াত। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “উত্তরবঙ্গ কোনো ‘সৎ মায়ের সন্তান’ নয়।” স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার এই অঞ্চলকে কেবল ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে উন্নয়নের যাত্রা শুরু হবে এই বঞ্চিত অঞ্চল থেকেই। বিশেষ করে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি ও অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটানোর অঙ্গীকার করেন তিনি। তিস্তাপাড়ের হাজার হাজার মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতিটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ নদী ভাঙন ও সেচ সমস্যা এই অঞ্চলের প্রধান অন্তরায়।
জনসমুদ্র ও ইনসাফ কায়েমের প্রত্যয়
এদিন সকাল থেকেই কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস, ট্রাক এবং নৌকায় করে মানুষের ঢল নামে হাতীবান্ধার তিস্তা হেলিপ্যাড মাঠে। বেলা ১টা ৩৫ মিনিটে ডা. শফিকুর রহমান হেলিকপ্টারে সভাস্থলে পৌঁছালে লাখো জনতা স্লোগানে স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। এর আগে সকালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠেও তিনি বিশাল এক জনসভায় অংশ নেন।
নারী অধিকার ও তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নিয়েও কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে আসন্ন নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে, তার এই ঝটিকা সফর উত্তরবঙ্গের নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ক্ষমতার লড়াইয়ে জামায়াত যে এক শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, লালমনিরহাটের এই জনসভা তার একটি বড় প্রমাণ।

