নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে পাবনার ঈশ্বরদীতে এক রাজনৈতিক নেতার ভয়াবহ উসকানিমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামীকে যারা ভোট দেবে, তাদের ‘রাতের অন্ধকারে নয়, বরং দিনের আলোতেই রগ কেটে দেওয়া হবে’ বলে প্রকাশ্য জনসভায় হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মক্কেল মৃধা। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) তার এই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
হুমকিদাতা মক্কেল মৃধা ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের আহ্বায়ক। ভিডিওতে দেখা যায়, গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) চর গড়গড়ি দাখিল মাদ্রাসা মাঠে পাবনা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি এই বক্তব্য দিচ্ছেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে জামায়াতের ভোটার ও কর্মীদের হুঁশিয়ারি দেন।
ভিডিওতে মক্কেল মৃধাকে বলতে শোনা যায়, “আমার বাড়ির যত খুন্তা, নিড়ানি, কুড়াল সব এই জামায়াত লুট করে নিয়েছে। এই জামায়াতের কোনো কর্মসূচি এখানে চলবে না। যারা জামায়াতকে ভোট দেবে, তাদের রাতের অন্ধকারে নয়, আমি দিনের বেলায় রগ কাটবো।” বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, “কোনো জামায়াত যদি ভোটকেন্দ্রে আসে, তবে ফল ভালো হবে না। আওয়ামী লীগ আমার ভাই, ধানের শীষে ভোট চাই।”
এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর পাবনা-৪ আসনের নির্বাচনী পরিবেশে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মক্কেল মৃধার সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, মক্কেল মৃধা ওই এলাকায় বেশ বিতর্কিত এবং তার বিরুদ্ধে আগেও একাধিক সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ নভেম্বর সাহাপুর ইউনিয়নে জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডলের নির্বাচনী বহরে হামলার ঘটনায় প্রধান আসামি এই মক্কেল মৃধা। ওই সময় জামায়াত কর্মীদের মোটরসাইকেল লুট করে তার বাড়ির পেছনে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, যা পরে পুলিশ উদ্ধার করে। এ ছাড়াও গত ৫ আগস্টের পর ওই এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের একাধিক অভিযোগে তার নাম উঠে এসেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, “আমরা বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিওটি হাতে পেয়েছি। এটি নির্বাচনী আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। ভুক্তভোগী পক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটের ভেতরে বা বাইরে যে কোনো দলের সাথেই রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্য জনসভায় ‘রগ কাটার’ মতো নৃশংস হুমকি দেওয়া সুস্থ রাজনীতির পরিপন্থী। বিশেষ করে যেখানে নির্বাচন কমিশন ও সেনাবাহিনী একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে এ ধরনের উসকানি পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে তুলতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত মক্কেল মৃধাকে গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে, জেলা বিএনপি এই ব্যক্তিগত বক্তব্যের দায় নিতে নারাজ হলেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এ ধরনের বক্তব্য দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে বলে মনে করছেন সাধারণ কর্মীরা।

