বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ১৫ হাজার ৩৮৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত মোট ১৭টি নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১৩টি সম্পূর্ণ নতুন এবং ৫টি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে, যা সরকারের বিভিন্ন খাতের অগ্রাধিকারকে তুলে ধরে।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এই প্রকল্পগুলো চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। সভায় প্রধান উপদেষ্টা এবং একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন। এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ দেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট ১৫ হাজার ৩৮৩ কোটি ৫১ লাখ টাকার মধ্যে অর্থায়নের উৎসগুলো নিম্নরূপ: সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন: ৯ হাজার ৪৫১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ (বিদেশি ঋণ): ৫ হাজার ৬০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন: ৩৭৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
এই মিশ্র অর্থায়ন পদ্ধতি দেশের উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর সরকারের নির্ভরতাকে প্রতিফলিত করে।
একনেকের এবারের অনুমোদনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দুটি মানবিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার-ভিত্তিক প্রকল্প, যা সদ্য সমাপ্ত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্য: ঢাকার মিরপুর ৯ নং সেকশনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন-২০২৪ এ কর্মক্ষমতা হারানো জুলাই যোদ্ধা পরিবারের স্থায়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা।
বিবরণ: এই প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৫৬০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এটি শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত যোদ্ধাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের কৃতজ্ঞতা এবং দায়িত্ব পালনের প্রতীক।
লক্ষ্য: বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন-২০২৪ এ শহীদ পরিবারের স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা। বিবরণ: জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জমিতে এই বিশেষ ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণ করা হবে। এটি শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি তাদের পরিবারকে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রদান করবে।
এছাড়াও, একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ সচিবালয়, পরিবহনপুল, মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট ও সচিব নিবাসের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিদ্যমান বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক ও অগ্নিসরঞ্জামাদি আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুমোদিত দুটি প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারকে জোরদার করবে:
৩টি অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১—এই তিনটি স্থানে নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে।
সোনাগাজী ২২০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প: নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকারের অঙ্গীকার পূরণে এই বড় আকারের সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ অনুমোদন পেয়েছে।
সেতু মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত দুটি প্রকল্প পরিবহন অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে: ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (লাইন-৬) (৩য় সংশোধিত): ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে এই প্রকল্প সংশোধিত আকারে অনুমোদন পেল।
সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন সিরাজগঞ্জ-রায়গঞ্জ (চান্দাইকোণা) (জেড-৫০৪২) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ: এটি আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সড়ক নিরাপত্তার মান উন্নত করবে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুমোদিত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো হলো: কৃষি মন্ত্রণালয়: “চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন” এবং “মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণ জোরদারকরণ (২য় সংশোধিত)” প্রকল্প। এই দুটি প্রকল্প দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনে সহায়তা করবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়: “নারায়ণগঞ্জ সবুজ ও স্থিতিশীল নগর উন্নয়ন প্রকল্প (এনজিআরইউডিপি)”, যা নগর পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়: “অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র (২য় সংশোধন)”, যা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর সেবার মান উন্নত করবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়: “ফলাফলের জন্য জলবায়ু প্রতিক্রিয়াশীল প্রজনন স্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যা পরিষেবা উন্নয়ন এবং সিস্টেম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প” সহ মোট তিনটি প্রকল্প, যার মধ্যে “মুন্সীগঞ্জে এসেনশিয়াল বায়োটেক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা (প্রথম সংশোধিত)” অন্যতম।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় একাডেমিক ও কেন্দ্রীয় গবেষণাগার নির্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ।
সভায় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প ও গৃহায়ন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সহ অন্যান্য উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এই ১৭টি প্রকল্পের অনুমোদন দেশের উন্নয়ন গতিধারা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

