দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশি আর স্নিগ্ধ সৈকতের ছোঁয়া পেতে পর্যটকদের অপেক্ষা করতে হবে আরও দীর্ঘ ৯ মাস। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামীকাল রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই দ্বীপ। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এই এলাকাকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি থাকবে না।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ছিল চলতি মৌসুমের শেষ দিন। এদিন সকাল ৭টায় কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে শেষবারের মতো ৬টি পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বিকেলে প্রায় ২ হাজার পর্যটক নিয়ে জাহাজগুলো ফেরার মাধ্যমেই শেষ হচ্ছে এবারের সংক্ষিপ্ত পর্যটন মৌসুম। দীর্ঘ বিরতির এই খবরে দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া।
সি ক্রুজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (স্কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, এ বছর প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেছেন। তবে বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও সময়সীমা কমিয়ে আনার কারণে এই সংখ্যা গত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সময়টা অন্তত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হলে তাদের বড় ধরণের আর্থিক লোকসান থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকত।
সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটন মৌসুম থাকলেও, এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও প্রবাল রক্ষার তাগিদে সরকার এবার মৌসুমটি সীমিত করে কেবল ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমরান হোসাইন সজীব নিশ্চিত করেছেন যে, রোববার থেকে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
দ্বীপের অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর। তাই ৯ মাসের এই দীর্ঘ বিরতি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “অধিকাংশ মানুষ সারা বছর এই তিন-চার মাসের আয়ের ওপর নির্ভর করে চলেন। হঠাৎ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য পর্যটন বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষ হতাশ ও দিশেহারা।”
সেন্ট মার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহমান দাবি করেছেন, অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিনিয়োগ করা টাকাও তুলতে পারেননি। ফলে লাভের বদলে লোকসানের ঘানি টানতে হচ্ছে তাদের। ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) এবং ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করায় সরকার দিন দিন সেখানে মানুষের চাপ কমাতে কঠোর হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১ নভেম্বর পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছিল ১ ডিসেম্বর থেকে। অর্থাৎ পর্যটকরা মাত্র দুই মাস পূর্ণাঙ্গভাবে দ্বীপটি ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। পরিবেশবাদীরা সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করলেও, দ্বীপবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবিটি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। আগামী ৯ মাস সেন্ট মার্টিন তার হারিয়ে যাওয়া রূপ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেলেও, দ্বীপের মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হতে যাচ্ছে কাল থেকেই।

