আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই বসার কথা ছিল জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা এসএসসির টেবিলে। নতুন কলম, নতুন স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের এক বুক আশা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুই বন্ধু। কিন্তু একটি বেপরোয়া ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে পরীক্ষার হলের বদলে তাদের ঠাঁই হলো হাসপাতালের মর্গে। বুধবার বেলা ১১টার দিকে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার নামুইট-দলগাছা সড়কের এই রক্তাক্ত দুর্ঘটনা কেবল দুটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, স্তব্ধ করে দিয়েছে দুটি পরিবারকেও।
নিহত সিজানুর রহমান (১৭) ও নেহাল হোসেন (১৭) দুজনেই নন্দীগ্রাম মা কেজি স্কুলের এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। সিজানুর নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার লিটন হোসেনের ছেলে হলেও নন্দীগ্রামের সিধইল গ্রামে নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতেন। অন্যদিকে নেহাল হোসেন উপজেলার ভরতেতুলিয়া গ্রামের রতন সরদারের সন্তান। প্রিয় দুই বন্ধুর অকাল বিদায়ে পুরো এলাকায় এখন শোকের মাতম।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে মোটরসাইকেলে করে দুই বন্ধু কাথম-কালিগঞ্জ সড়ক দিয়ে শিমলা বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। নামুইট ও দলগাছা গ্রামের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই বিপরীত দিক থেকে আসা একটি অজ্ঞাতনামা ট্রাক তাদের সামনে থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং তারা দুজনই ছিটকে পিচঢালা সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুই কিশোর।
দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে নন্দীগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ফায়ার সার্ভিসের সাব-অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান, তারা ঘটনাস্থলে গিয়েই দুই কিশোরকে নিথর অবস্থায় পান। পরে তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে দুজনের মধ্যে বেশ উৎসাহ ছিল। নানাবাড়িতে থেকে সিজানুর বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন এভাবে মাঝপথে ধুলোয় মিশে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
নন্দীগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ ঘাতক ট্রাকটি শনাক্তের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “ট্রাকটি পালিয়ে গেলেও আমরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে চালককে আটকের চেষ্টা চালাচ্ছি। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে।”
সড়কের এই নৈরাজ্য আর কত প্রাণ কেড়ে নেবে, তা নিয়ে আবারও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে দুই মেধাবী ছাত্রের এমন মৃত্যু নন্দীগ্রামের সাধারণ মানুষকেও শোকাতুর করে তুলেছে।

