সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের বঞ্চনার ইতিহাসের পাশাপাশি জাতীয় ক্রিকেটের মর্যাদাহানির অভিযোগে সরব হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি বালক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিস্ময় মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) খেলতে না দেওয়া কেবল একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো দেশের জন্য একটি চরম অপমানজনক ঘটনা।
তিনি উল্লেখ করেন, মোস্তাফিজ তার অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে বিশ্বদরবারে সাতক্ষীরা তথা বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অথচ একটি প্রতিবেশী দেশে তাকে খেলতে না দেওয়া বা যেতে না দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বিব্রতকর।
আইপিএলের এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বর্তমান ভূমিকারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দেশের সম্মানের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না।
জামায়াত আমির জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিসিবি ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি খেলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ ছিল। দেশের মানুষের দাবি ছিল খেলাটি নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যু যেমন শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হোক।
তবে আইসিসি এই ন্যায়সংগত দাবিটি মেনে না নেওয়ায় তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনায় লজ্জিত এবং মর্মাহত। আইসিসির উচিত তাদের এই সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করা এবং ক্রিকেটের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা।”
ক্রিকেটের পাশাপাশি সাতক্ষীরার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর দীর্ঘ আলোকপাত করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জুলুম ও অন্যায়ের শিকার হয়েছে সাতক্ষীরা জেলার মানুষ।
তার মতে, দেশের অন্য কোনো জেলায় সাতক্ষীরার মতো এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়নি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই জেলার মানুষের ওপর বুলডোজার চালানো হয়েছে এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
২০১৫ সালের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, সেই কঠিন সময়ে তিনি মোটরসাইকেলে করে সাতক্ষীরার গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে এখানকার দ্বীনদার ও ইমানদার মানুষদের ওপর নির্মমতা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি তখন এসেছিলাম ৪৫ জন শহীদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। যেসব মায়েদের কোল খালি করা হয়েছে, যেসব বোনদের বিধবা করা হয়েছে, তাদের চোখের পানি মুছতে আমি এখানে ছুটে এসেছিলাম।”
ডা. শফিকুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, সাতক্ষীরাকে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের মূল উন্নয়ন ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। স্থানীয় মানুষের বরাতে তিনি বলেন, সরকার এই জেলার সঙ্গে বরাবরই সৎমায়ের মতো আচরণ করে এসেছে।
তিনি মনে করেন, সাতক্ষীরার মানুষ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তাদের পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিচার হবে এবং আল্লাহই সম্মানের মালিক।
নির্বাচনী এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুল। জনসভায় দলটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থেকে আগামী নির্বাচনের রূপরেখা ও দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি তার বক্তব্যে সাতক্ষীরার মানুষের ত্যাগ ও আন্দোলনের প্রশংসা করে আসন্ন নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এছাড়াও জনসভায় বক্তব্য দেন সাতক্ষীরার বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীরা। তাদের মধ্যে ছিলেন সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ এবং সাতক্ষীরা-২ আসনের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক।
সাতক্ষীরা-৩ ও ৪ আসনের প্রার্থীরাও তাদের বক্তব্যে স্থানীয় সমস্যা ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। জনসভাটি সঞ্চালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।
মাঠজুড়ে সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এমন জনসমাবেশ ঘিরে সাতক্ষীরার নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যের শেষে বলেন, সাতক্ষীরাকে অবহেলার দিন শেষ হতে চলেছে। ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে কোনো জেলা বা কোনো ব্যক্তি বৈষম্যের শিকার হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

