বাংলাদেশে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী সরকারের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (ইন্টেরিম সরকার) যদি সংবিধান সংস্কার এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি ‘গণভোট’ আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না— এমন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি এই মুহূর্তে দেশকে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী দুটি বিপরীত মেরুতে বিভক্ত হিসেবে দেখছেন— ৭২-এর বাকশালপন্থী শক্তি এবং ২০২৪ সালের বিপ্লবপন্থী শক্তি।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) বিকেলে খুলনা মহানগরীর ঐতিহাসিক বাবরী চত্বরে (শিববাড়ী মোড়) জামায়াতে ইসলামীসহ ৮টি সমমনা ইসলামপন্থী দল আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। এই সমাবেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দ্রুত গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার এবং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথ সুগম করার দাবিতে আয়োজিত হয়।
মাওলানা মামুনুল হক তার বক্তব্যে ‘জুলাই বিপ্লব’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রক্তের সাগর পেরিয়ে অর্জিত এই বিপ্লবের পর ফ্যাসিবাদী শক্তি যেন আর বাংলার মাটিতে ফিরে আসতে না পারে।
তিনি বলেন, “জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি কার্যকরের জন্য আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। এখন সেই জুলাই সনদকে চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দিতে হলে অবিলম্বে একটি গণভোটের আয়োজন করতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে তাঁর সরাসরি বার্তা ছিল: “একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে এই মাহাত্ম্যকে নষ্ট করবেন না। জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই গণভোট আয়োজন করা হোক।”
তাঁর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের এই ট্রানজিশন পিরিয়ড বা রূপান্তরের সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি সরকার এই মুহূর্তে জনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে তাদেরও কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, “ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তী সরকার, ইতিহাস আপনাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। কলঙ্ক নিয়ে আপনাদেরও বিদায় নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলার মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ। জনগণ যেমন দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে প্রস্তুত, তেমনি গণভোটের বাক্সে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তুত। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে যদি কোনো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়, তবে তার দায়ভার সম্পূর্ণরূপে বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে এই বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
সমাবেশটি মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ইসলামপন্থী এবং ডানপন্থী দলগুলোর জোটবদ্ধ শক্তির প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
জামায়াতে ইসলামী
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
খেলাফত মজলিস
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)
বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদেক হক্কানী, জাগপার সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বিডিপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আউয়াল ও মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ। এছাড়া, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আজাদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য রাখেন।
মাওলানা মামুনুল হক তার বক্তব্যে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন, যা চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখার একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দেয়।
সোমবার দুপুর ১২টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়। এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারী বক্তারা তাদের বক্তৃতায় মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন:
১. গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক পরিবর্তন: জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও দাবিসমূহকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে দেশের ভবিষ্যৎ সরকার পদ্ধতি নির্ধারণে দ্রুত গণভোটের আয়োজন করা। ২. গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা: দেশে স্থায়ী সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ৩. জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষা: ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তন ঠেকানো এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা মহানগরী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের পরিচালনায় সমাবেশটিতে বিভিন্ন দল ও পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য রাখেন। ইসলামী গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে সমাবেশে ভিন্ন মাত্রা যোগ করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামপন্থী দলগুলোর এই ঐক্যবদ্ধ সমাবেশ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দেওয়া কঠোর বার্তা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তনের পরও দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নগুলো এখনও কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই এই বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির দাবিগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, নতুবা তারা নিজেরাই রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়বেন।

