দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিফট অবশেষে মেরামত করা হয়েছে এবং তা পুনরায় সচল হয়েছে। হাসপাতালের দুটি লিফটের মধ্যে একটি অকার্যকর থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে যে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছিল, লিফটটি সচল হওয়ার পর তাতে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এই সমস্যা নিয়ে সম্প্রতি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দেশের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যে সাধারণ জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনাটি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, ৮ তলা বিশিষ্ট একটি ভবনে দৈনিক হাজারো রোগীর যাতায়াতের জন্য লিফটের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবা অচল থাকা ছিল গুরুতর প্রশাসনিক দুর্বলতার পরিচায়ক।
জানা যায়, গত রবিবার (৩০ নভেম্বর) ‘হাসপাতালের দুই লিফটের একটি নষ্ট, ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজনরা’ শিরোনামে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই সংবাদ প্রকাশের পরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে এবং দ্রুততার সঙ্গে অচল লিফটটি মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালটি জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এত বিশাল সংখ্যক রোগীর আগমন সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে দুটি লিফটের মধ্যে একটি অচল থাকায় অসুস্থ ও বয়স্ক রোগীদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ট্রলিতে শায়িত রোগীদের উপর-নিচে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল।
আজ সোমবার (১ ডিসেম্বর) সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের দুটি লিফটই সম্পূর্ণরূপে সচল রয়েছে। লিফটগুলোর সামনে রোগী ও স্বজনদের ভিড় থাকলেও, দুটি লিফট চালু থাকায় অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। রোগী বা তাদের স্বজনরা এখন অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ট্রলিতে করে রোগী বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে হাসপাতালের ৮ তলা ভবনটিতে নির্বিঘ্নে উঠানামা করতে পারছেন। দুটি লিফট চালু হওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মাঝে দৃশ্যত স্বস্তি বিরাজ করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার একজন বাসিন্দা ইসমত আরা, যিনি নিয়মিত হাসপাতালে যাতায়াত করেন, তিনি বলেন, “আগে একটি লিফট বন্ধ থাকায় উপরে ওঠা-নামা করতে অস্বাভাবিক বেশি সময় লাগছিল। অনেকে বাধ্য হয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করতেন, যা অসুস্থ রোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। এখন দুটি লিফট চালু হওয়ায় আমাদের ভোগান্তি অনেকটাই কম হয়েছে।”
লিফট সচল রাখার ক্ষেত্রে কর্মরত একজন লিফট অপারেটর, আব্দুল আহাদ, নিশ্চিত করেন যে ঢাকা থেকে ইঞ্জিনিয়ার এসে অচল লিফটটি মেরামত করেছেন। তিনি বলেন, “এখন দুটি লিফটই পুরোপুরি চালু আছে। তবে সমস্যা হলো, অনেক সময় স্বজনেরা একসঙ্গে অতিরিক্ত সংখ্যক লোক লিফটে উঠানামা করেন। আমরা বারবার বারণ করলেও তারা তা মানছেন না।” অতিরিক্ত ভিড় বা ধারণক্ষমতার বেশি লোক উঠানামা করলে লিফট আবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা নতুন করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
রোগী ও তাদের স্বজনরা মনে করেন, কেবল সংবাদ প্রকাশের পরই দ্রুত লিফট মেরামত করাই যথেষ্ট নয়। বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একটি নিয়মিত এবং সঠিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাদের দাবি, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি করেন, তাহলে লিফটগুলো কম নষ্ট হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও স্থায়ীভাবে কমবে।” এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়া সরকারি সেবা প্রদান ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
এই প্রসঙ্গে জানতে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তিনি একাধিকবার ফোন রিসিভ করেননি। হাসপাতাল প্রধানের এই নীরবতা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং সার্বিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো যেমন লিফট, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি সরবরাহ— এই সবই অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা অকার্যকর থাকা সরাসরি রোগীর জীবন ও সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
জনদুর্ভোগ লাঘব হলেও, এই ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা এবং নিয়মিত তদারকির অভাবের বিষয়টিকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের অপ্রত্যাশিত বিভ্রাট এড়াতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।

