গাজীপুরের পূবাইল এলাকায় সোমবারের সকালটি অন্য আট-দশটি দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু বেলা ১১টার দিকে নয়নীপাড়া রেলক্রসিং সংলগ্ন এলাকায় যা ঘটল, তা কেবল প্রত্যক্ষদর্শীদের নয়, পুরো জনপদকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। চলন্ত ট্রেনের নিচে দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে এক মায়ের ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনা কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর গভীরে লুকিয়ে থাকা এক চরম আর্তনাদ।
নিহত নারীর নাম হাফেজা খাতুন মালা। পঁচিশ বছর বয়সী এই তরুণী গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ নতুন সোমবাজার এলাকার মোজাম্মেল হকের মেয়ে। তার দুই সন্তানের নাম তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, তাদের নিথর দেহের দৃশ্য উপস্থিত সাধারণ মানুষকে কান্নায় ভাসিয়েছে। রেললাইনের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খেলনা আর জুতো যেন এক অসমাপ্ত শৈশবের করুণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মালা বেগমকে সকালে ওই এলাকায় দীর্ঘক্ষণ পায়চারি করতে দেখা গিয়েছিল। তার কোলে ছিল ছোট সন্তান এবং পাশে ছিল বড়টি। ট্রেনের বাঁশি যখন কানে আসছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তিনি সন্তানদের নিয়ে লাইনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। চালকের পক্ষে ট্রেন থামানো সম্ভব ছিল না। মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। চলন্ত ট্রেনের প্রচণ্ড আঘাতে মা ও দুই সন্তানের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় এক দোকানদার জানান, সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে কারও কিছু করার সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, “আমরা দেখলাম একজন নারী দৌড়ে লাইনের দিকে যাচ্ছেন, চিৎকার করার আগেই ট্রেনটি তাদের ওপর দিয়ে চলে গেল।” এই দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত পুলিশে খবর দেন। ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় জমে যায়, কিন্তু কারো মুখেই কোনো শব্দ ছিল না।
খবর পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পূবাইল থানা পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা এসে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। ততক্ষণে মালার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি একটি পরিকল্পিত আত্মহত্যা। তবে এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনে ঠিক কী কারণ ছিল, তা এখনো অস্পষ্ট।
পূবাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে যাই। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। মা ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলছে। আমরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি যাতে এই আত্মহননের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যায়।”
পুলিশের তদন্তে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে মালার ব্যক্তিগত জীবন। একজন পঁচিশ বছর বয়সী মা কেন তার কোলের সন্তানদের নিয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নেবেন, সেই প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পারিবারিক কলহ, দারিদ্র্য নাকি দীর্ঘদিনের কোনো মানসিক অবসাদ তাকে এই প্রান্তিক সীমানায় ঠেলে দিয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে জানা যাচ্ছে যে, মালা গত কিছুদিন ধরে মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত ছিলেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের সামনে আবারও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক টানাপোড়েন অনেক সময় মানুষকে আত্মঘাতী করে তোলে। বাংলাদেশে নারীদের আত্মহত্যার হার নিয়ে কাজ করা সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা তাদের কষ্টের কথা বলার মতো নির্ভরযোগ্য কাউকে খুঁজে পান না। যখন তারা মনে করেন আর কোনো পথ খোলা নেই, তখনই তারা সন্তানদের নিয়ে এমন চরম পথ বেছে নেন।
গাজীপুরের এই ঘটনাটি কেবল একটি থানায় হওয়া সাধারণ ডায়েরি হয়ে থাকা উচিত নয়। এটি আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পরিবারে বা আশেপাশে কেউ বিষণ্নতায় ভুগলে তার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় সামান্য সহানুভূতি বা কথা বলার সুযোগ একজন মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। মা হাফেজা খাতুন মালার এই মৃত্যু যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা আমাদের কাছের মানুষদের কতটা একা করে দিচ্ছি।
রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে আইনগত প্রক্রিয়া বা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট যাই হোক না কেন, নয়নীপাড়া রেলক্রসিংয়ের সেই রক্তের দাগ আর সন্তানহারা পরিবারের আর্তনাদ সহজে মুছে যাবে না। ওই এলাকার বাতাসে এখন কেবলই শোকের ছায়া। যারা এই দৃশ্য দেখেছেন, তাদের চোখেমুখে ট্রমা স্পষ্ট।
মালার বাবার বাড়িতেও এখন শোকের মাতম। যে মেয়ে আর নাতি-নাতনিদের সুস্থ দেখার কথা ছিল, তাদের ছিন্নভিন্ন মরদেহের খবর বাবা মোজাম্মেল হক কীভাবে সইবেন, তা বলার ভাষা কারোর নেই। আত্মীয়-স্বজনরা ভিড় করেছেন তাদের বাড়িতে, কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা কারোর জানা নেই। একটি সাজানো সংসার মুহূর্তের সিদ্ধান্তে কীভাবে তছনছ হয়ে যায়, এই ঘটনা তারই এক নির্মম প্রমাণ।
শহরের যান্ত্রিকতায় যখন আমরা সবাই ব্যস্ত, তখন আমাদেরই পাশে কেউ একজন হয়তো নীরবে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মালা বেগমের এই বিদায় আমাদের মনে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেল। এই মৃত্যু কি কেবলই একটি দুর্ঘটনা, নাকি সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতা? তদন্ত চলবে, প্রতিবেদন আসবে, কিন্তু ফিরে আসবে না সেই দুই শিশু, যারা হয়তো জানতও না কেন তাদের মা তাদের নিয়ে ওই ভয়ংকর ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
গাজীপুর ও এর আশেপাশের এলাকায় এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মানুষ শোক প্রকাশ করছেন। তবে শোক প্রকাশের পাশাপাশি যদি আমরা আমাদের চারপাশের মানুষের মানসিক অবস্থার দিকে একটু খেয়াল রাখি, তবেই হয়তো ভবিষ্যতে এমন আরও অনেক মালাকে এবং তাদের সন্তানদের অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
পুলিশের তদন্ত চলমান থাকায় এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ আত্মহত্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে। পূবাইল থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা মালার স্বামী ও অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এতে করে পারিবারিক কোনো ঝগড়া বা নির্যাতনের অভিযোগ আছে কিনা, তাও বেরিয়ে আসবে।
সবশেষে বলা যায়, এই নিথর দেহগুলো কেবল মৃতদেহের পরিসংখ্যান নয়। এগুলো একেকটি স্বপ্নভঙ্গের গল্প। রেললাইনের পাথরে জমে থাকা রক্ত শুকিয়ে যাবে, কিন্তু হাফেজা খাতুন মালা আর তার দুই সন্তানের এই করুণ বিদায় স্থানীয়দের স্মৃতিতে থেকে যাবে দীর্ঘকাল। একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজই পারে এমন ট্র্যাজেডি রোধ করতে।

