সাভারে গত সাত মাসে ছয়টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ‘সিরিয়াল কিলার’ সবুজ শেখ ওরফে মশিউর রহমান সম্রাটের অতীত খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে গা শিউরে ওঠা সব তথ্য। এই দুর্ধর্ষ কিলার কেবল ঢাকার অলিগলিতেই নয়, নিজ গ্রামে ফিরলেও মেতে উঠতেন চুরি ও ছিনতাইয়ের নেশায়। এমনকি নিজের জন্মদাতা পিতার গলায় ছুরি ধরতেও দ্বিধা করেননি এই ঘাতক।
মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামে সবুজের পৈতৃক ভিটায় গিয়ে দেখা যায় এক বিষণ্ণ পরিবেশ। টিন আর কাঠের তৈরি জরাজীর্ণ একটি ঘরে বাস করেন সবুজের অসুস্থ মা মমতাজ বেগম ও বৃদ্ধ বাবা পান্না শেখ। ছেলের এমন ভয়ঙ্কর কীর্তির কথা জানাজানি হওয়ার পর থেকে লোকলজ্জায় দিনের বেলা আত্মগোপনে থাকছেন বাবা। আর ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত মা মমতাজ বেগম ছেলের খুনের খবর শুনে এখন প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন।
পরিবারের সঙ্গে আজন্ম বিচ্ছেদ সবুজের মা ডুকরে কেঁদে উঠে জানান, সবুজ কোনোদিন বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দেয়নি। নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করলেও কোনোদিন স্ত্রী বা সন্তানকে বাবা-মায়ের সামনে আনেনি। এমনকি এলাকাবাসীও কোনোদিন তার পরিবারের দেখা পায়নি। ৪ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবুজ সবার বড় হলেও পরিবারের প্রতি তার কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। তার অন্য ভাইয়েরা পরিশ্রম করে সংসার চালালেও সবুজের নেশা ছিল অপরাধ জগতে।
নিজ গ্রামেই যখন ত্রাস স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবুজের বেড়ে ওঠা ঢাকার জুরাইন ও সাভার এলাকায়। তবে গত ১০ বছর ধরে তার বাবা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে সবুজ মাঝে মাঝে সেখানে আসতেন। কিন্তু তিনি গ্রামে আসা মানেই ছিল এলাকায় চুরির হিড়িক পড়া। এক বছর আগে একটি অটোরিকশা ভাড়া করে গ্রামে এসে চালকের গলায় ছুরি ঠেকিয়ে সেটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন সবুজ।
ওই সময় গ্রামবাসী ও তার বাবা তাকে ধরে কেরানীগঞ্জের একটি রিহ্যাব সেন্টারে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে পালিয়ে এসে উল্টো নিজের বাবা ও দুই প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ ঠুকে দিয়েছিলেন এই ‘সাইকো’ স্বভাবের যুবক। এলাকার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আবির জানায়, সবুজ মাঝেমধ্যেই নিজের সাথে নিজে কথা বলতেন এবং অকারণে লোকজনকে গালিগালাজ করতেন।
ইউপি সদস্য ও পুলিশের ভাষ্য হলদিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোহেল খান জানান, সবুজের পরিবার দীর্ঘদিন এলাকায় না থাকায় তারা এখানকার ভোটার নন। তবে সম্প্রতি এলাকায় সবুজের আনাগোনা বাড়লে চুরি-ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গিয়েছিল। এখন গ্রেফতারের খবর শুনে সবাই বুঝতে পারছেন যে, ওইসব অপরাধের নেপথ্যে এই সবুজই ছিলেন।
লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, সবুজের বিরুদ্ধে ওই থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা নেই। তবে প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী তাকে একজন ‘সাইকো’ বা মানসিক বিকারগ্রস্ত অপরাধী হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
সাভারে ছয়টি খুনের রহস্য উন্মোচনের পর এখন মুন্সীগঞ্জের নিভৃত পল্লীর এই বাড়িটিই হয়ে উঠেছে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। যে সন্তানকে ঘিরে বাবা-মা এক সময় স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই সন্তানই আজ ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে সংবাদপত্রের শিরোনাম।

