নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দের প্রথম দিনেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ময়মনসিংহের গফরগাঁও। ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এবং দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সন্ধ্যায় গফরগাঁও পৌর শহরের ইসলামিয়া স্কুলের সামনে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেলে প্রতীক পাওয়ার পর বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আখতারুজ্জামান বাচ্চুর সমর্থকরা ইসলামিয়া স্কুলের সামনে জড়ো হচ্ছিলেন একটি বিজয় শোভাযাত্রা করার জন্য। ঠিক সেই সময় ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে মিছিল বের করেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবি সিদ্দিকুর রহমানের অনুসারীরা। দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে চলে এলে মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বাদানুবাদ থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা দ্রুতই লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্রের লড়াইয়ে রূপ নেয়।
সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবর্ষণের শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাবেক ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং সোহাগসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা কয়েকটি স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বর্তমানে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল আল মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ এবং সহিংসতার সাথে যারা জড়িত, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এই হামলার জন্য সরাসরি বিদ্রোহী প্রার্থীকে দায়ী করেছেন বিএনপির মূল প্রার্থী আখতারুজ্জামান বাচ্চু। তিনি অভিযোগ করেন, “আমার নেতাকর্মীদের ওপর সুপরিকল্পিতভাবে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুলি চালানো হয়েছে। এই হামলার মূল উস্কানিদাতা বিদ্রোহী প্রার্থী এবি সিদ্দিকুর রহমান। আমি অবিলম্বে এই সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।”
তবে পালটা অভিযোগে এবি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “প্রতীক পাওয়ার পর আমার বিশাল মিছিল বের হয়েছিল। আমি নিজে গাড়িতে ছিলাম। আমরা কারও ওপর হামলা করিনি, বরং আমাদের মিছিলেই বাধা দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে এই সংঘর্ষের নেপথ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের ক্ষোভ সামনে চলে এসেছে। স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশের অভিযোগ, বিদ্রোহী প্রার্থী এবি সিদ্দিকুর রহমান বিগত সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সালমান এফ রহমানের ব্যবসায়িক অংশীদার। এমনকি জনতা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলার আসামিও তিনি। নেতাকর্মীদের দাবি, এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণেই তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, আর এখন তিনি দলের ক্ষতি করতেই স্বতন্ত্র হিসেবে মাঠে নেমেছেন।
দুদকের মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এবি সিদ্দিকুর রহমান কিছুটা অবজ্ঞার সুরেই বলেন, “মামলা হতেই পারে, এটা কোনো বড় বিষয় নয়।” তবে এই সংঘর্ষ গফরগাঁওয়ের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখছিল, প্রথম দিনের এই সহিংসতা তাতে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির কথা বলা হলেও রাত পর্যন্ত পুরো পৌর শহরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সেনাবাহিনী ও বিজিবি টহল জোরদার করায় নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, নির্বাচনী প্রচার যত এগোবে, এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও সহিংস রূপ নিতে পারে।

