দেশের পোল্ট্রি শিল্পে আবারও ঘনিয়ে আসছে সিন্ডিকেট আতঙ্ক। পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা নিশ্চিত না করেই একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে সরকার। ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬’-এর খসড়ায় এই আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক খামারিরা অস্তিত্ব সংকটে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পোল্ট্রি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে ডিম ও মুরগির মাংসের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশের পোল্ট্রি খাত উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মুরগির সংখ্যা ছিল ২৬৮৩.৯৩ লাখ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৬০.৭০ লাখে। একই সময়ে ডিমের উৎপাদন ১১৯১.২৪ কোটি থেকে বেড়ে ২৪৪০.৬৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
তবে এই বিশাল অগ্রগতির মূল ভিত্তি হলো একদিন বয়সী বাচ্চার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। খামারিদের মতে, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ বাচ্চা উৎপাদন হয়, তা চাহিদার তুলনায় অনেক সময় অপ্রতুল থাকে। বিশেষ করে কোনো রোগ প্রাদুর্ভাব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানির মাধ্যমেই সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার এই নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী বাণিজ্যিক বাচ্চা আমদানি বন্ধ হলে কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে কোটি কোটি বাচ্চার বাজার জিম্মি হয়ে পড়বে। ক্ষুদ্র খামারিরা তাদের নির্ধারিত চড়া দামে বাচ্চা কিনতে বাধ্য হবেন। এটি কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরির আইনি বৈধতা দেওয়া।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই নীতিমালার খসড়া প্রণয়নে প্রান্তিক খামারিদের কোনো কার্যকর অংশগ্রহণ ছিল না, যা সরকারের ‘স্বনির্ভর পোল্ট্রি শিল্প’ গড়ার লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, একদিন বয়সী বাণিজ্যিক বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ হলেও গ্র্যান্ড প্যারেন্ট (জিপি) স্টক আমদানির সুযোগ থাকবে। আর ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ প্যারেন্ট স্টক (পিএস) আমদানির অনুমতি মিলবে।
বিশেষজ্ঞরা এই ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র’ শব্দবন্ধটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রয়োজনীয়তা কে নির্ধারণ করবে? প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে সংকটকালে অনুমোদন পেতে দেরি হলে হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমদানি নিষিদ্ধের আগে আমাদের দেখতে হবে আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো কাঠামো আমাদের আছে কি না।”
পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, পোল্ট্রি উৎপাদন একটি দীর্ঘমেয়াদী চক্র। জিপি স্টক থেকে বাণিজ্যিক বাচ্চা উৎপাদনে প্রায় এক বছর সময় লাগে। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট মেটাতে আমদানির বিকল্প নেই।
কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার জানান, ৮০ লাখ মানুষের জীবনজীবিকা ও ৬০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে যদি প্রস্তুতি ছাড়া আমদানি বন্ধ হয়।
অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান মনে করেন, কোনো একক গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের পকেট থেকেই অতিরিক্ত টাকা খসবে।
সার্বিক বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, “এই নীতিমালাটি হুট করে নেওয়া হয়নি। ২০২১ সাল থেকে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় ব্রিডার ফার্মগুলোকে শক্তিশালী করা।”
তিনি আরও আশ্বাস দেন যে, নীতিমালা বাস্তবায়নের সময় কোনো অসংগতি দেখা দিলে তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো পোল্ট্রি খাতকে আরও সংগঠিত ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

