প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশির কিনারে গলায় একটি প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে প্রতিদিন ঘুরে বেড়ান ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। তাতে লেখা— ‘আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। চা খেয়ে আমাকে সহযোগিতা করুন।’ জীবন সায়াহ্নে এসে এই জীবনযুদ্ধের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদপত্রে উঠে আসার পর এবার সেই বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।
অসহায় এই চা বিক্রেতার নাম আবুল হোসেন। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে দ্বীপে যখন পরিবেশ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছিল, তখন তার মুখোমুখি হন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফি। তবে আইন প্রয়োগের কঠোরতার বদলে সেখানে দেখা গেল এক মানবিক দৃষ্টান্ত। সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ থাকায় আবুল হোসেনকে জরিমানা করার পরিবর্তে তার কাছে থাকা প্লাস্টিকের সরঞ্জামগুলো নগদ মূল্যে কিনে নেয় প্রশাসন।
অভিযান পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফি বলেন, “সেন্টমার্টিনের ইকো-সিস্টেম রক্ষায় প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আবুল হোসেনের মতো মানুষের জীবিকার প্রশ্নটিও সংবেদনশীল। মানবিক দিক বিবেচনায় আমরা তাকে দণ্ড না দিয়ে বরং বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পরিবারের স্থায়ী অন্নসংস্থানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
আবুল হোসেনের জীবনের এই লড়াই প্রথম নজরে আসে গত ১৫ ডিসেম্বর, যখন তার সংগ্রামী জীবন নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল কীভাবে বার্ধক্য আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এই বৃদ্ধ তার বড় পরিবারের ঘানি টেনে যাচ্ছেন।
সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে আবেগাপ্লুত আবুল হোসেন জানান, পর্যটন মৌসুমে চা বিক্রি করে কোনোমতে দিন কাটলেও বছরের বাকি সময়টা তাকে নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তিনি বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আমার সব প্লাস্টিক কাপ আর সরঞ্জাম কিনে নিয়েছেন। প্রশাসন যদি সত্যিই আমার জন্য স্থায়ী কোনো ব্যবস্থার সুযোগ করে দেয়, তবে জীবনের শেষ দিনগুলো একটু শান্তিতে পার করতে পারব।”
দ্বীপের বাসিন্দারাও প্রশাসনের এই ইতিবাচক ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ নুর বলেন, “সেন্টমার্টিনের মানুষের জীবন পর্যটনকেন্দ্রিক। বছরে মাত্র কয়েক মাস আয় হয়, বাকি সময়টা আমাদের উপোস থাকতে হয়। আবুল দাদাকে যে পরিমাণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আমাদের সবার চোখে পড়ে। প্রশাসন তার পাশে দাঁড়ালে দ্বীপের সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হবে।”
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সেন্টমার্টিনকে প্লাস্টিকমুক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জীবনমান উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। আবুল হোসেনের মতো যারা প্রকৃত অর্থেই অসহায়, তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পর্যটন নগরীর এই মানবিক পদক্ষেপ এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।

