সাভারের জনপদে গত সাত মাস ধরে চলা এক বিভীষিকার অবসান ঘটিয়েছে পুলিশ। একের পর এক রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে মশিউর রহমান খান সম্রাট (৩৫) নামের এক ‘ভবঘুরে’ যুবকের নাম। পুলিশের দাবি, গত সাত মাসে সাভারে ঘটে যাওয়া ছয়টি নৃশংস খুনের নেপথ্যে সরাসরি জড়িত এই সম্রাট।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে সাভার মডেল থানায় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) আরাফাতুল ইসলাম। এর আগে গতকাল রোববার দুপুরে সাভার পৌর এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। আজ তাকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত মশিউর রহমান খান সম্রাট সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনী মহল্লার মৃত সালামের ছেলে। কোনো সুনির্দিষ্ট পেশা না থাকায় সে এলাকায় ভবঘুরে হিসেবে পরিচিত ছিল। দিনভর সাভারের বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো এই যুবকের আড়ালে যে এক রক্তপিপাসু ঘাতক লুকিয়ে ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কেউ।
পুলিশ জানায়, সম্রাটের এই খুনের নেশা শুরু হয় প্রায় সাত মাস আগে। সাভার পৌর এলাকার মডেল মসজিদের পাশে আসমা নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার এই নৃশংস যাত্রা শুরু। এর কয়েক মাস পর ২৯ আগস্ট রাতে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে হাত-পা বেঁধে এক যুবককে হত্যা করে সে।
হত্যার নৃশংসতা এখানেই থেমে থাকেনি। গত ১১ অক্টোবর রাতে সেই একই কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে এক অজ্ঞাতনামা নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর দুপুরে থানা রোড সংলগ্ন পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে এক পুরুষের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো সাভারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম জানান, অপরাধস্থলের ধরন ও হত্যার ধরন বিশ্লেষণ করে পুলিশ সন্দেহভাজন এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে। বিশেষ করে পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি ছিল ঘাতকের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার পর গতকালের জোড়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্রাটের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপরই চিরুনি অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট এই ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে। তবে এই ‘সিরিয়াল কিলিং’-এর পেছনে তার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, সম্রাট যাদের হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে নিহত বৃদ্ধা আসমা ছাড়া বাকি পাঁচজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী এবং ওসি অপারেশন হেলাল উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সম্রাটকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে অজ্ঞাত মরদেহগুলোর পরিচয় এবং খুনের প্রকৃত মোটিভ উদ্ধারে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সাভারের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— একজন মানুষ দিনের পর দিন কীভাবে এতগুলো প্রাণ কেড়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে এলাকায় ঘুরে বেড়ালো। পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আপাতত ঘাতক সম্রাট শ্রীঘরে থাকলেও তার অপরাধের গভীরতা মাপতে এখন ব্যস্ত গোয়েন্দারা।

