কুয়াশাভেজা সকালে প্রতিদিনের মতো স্বপ্ন আর সংগ্রামের ঝুলি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন গোলাম আরাফাত (২২)। একদিকে কলেজের পাঠ্যবই, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে জুতা তৈরির কারখানার কাজ—এই দুই নিয়েই ছিল তার জীবন। কিন্তু একটি ঘাতক ট্রাকের বেপরোয়া গতি আজ সকালে চিরতরে থামিয়ে দিয়েছে এক লড়াকু তরুণের পথচলা।
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার নওপাড়া-বোয়ালমারী সড়কে আজ রবিবার সকালে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নওপাড়া রাস্তার মোড় থেকে আঞ্চলিক সড়কে প্রবেশের মুহূর্তে সাব্বিরের ইটভাটার কাছে একটি ডাম্প ট্রাকের নিচে চাপা পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার স্বপ্নগুলো ধুলোয় মিশে যায়।
নিহত আরাফাত উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের তারাপুর গ্রামের গোলাম কিবরিয়ার ছেলে। তিনি স্থানীয় হাজী আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ‘জুবায়ের ফুটওয়্যার’ নামক একটি কারখানায় কাজ করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে আরাফাত মোটরসাইকেল চালিয়ে তার কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি দ্রুতগামী ডাম্প ট্রাক তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ছিটকে পড়ে ট্রাকের চাকার নিচে পিষ্ট হন তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের বারান্দায় যখন আরাফাতের নিথর দেহ পড়ে ছিল, তখন তার সহকর্মী ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। তার এক সহপাঠী জানান, আরাফাত ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী। নিজের পড়ার খরচ নিজেই চালাতেন, আবার বাবাকেও সাহায্য করতেন। সেই মানুষটি এভাবে চলে যাবে, কেউ ভাবতেও পারছেন না।
দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি ফেলে চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মধুখালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তন্ময় মন্ডল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, ট্রাকটি জব্দ করার প্রক্রিয়া চলছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফরিদপুরের এই আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ইটভাটার ট্রাক ও ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। আরাফাতের এই অকাল মৃত্যু সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। এলাকাবাসীর দাবি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অদক্ষ চালকদের কারণেই এভাবে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ।
আজ বিকালেই তারাপুর গ্রামে আরাফাতের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মেধাবী এই ছাত্র ও শ্রমজীবী তরুণের মৃত্যুতে পুরো নওপাড়া ইউনিয়ন জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি সাধারণ কৃষক পরিবারের আশার প্রদীপ যেন নিভে গেল মুহূর্তের অসাবধানতায়।

