পবিত্র রমজান মাস আসতে বাকি আর মাত্র এক মাস। প্রতি বছরের মতো এবারও রোজার আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানা আশ্বাসের কথা শোনা গেলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর বাজারগুলোতে এখনই চাল, ডাল, চিনি ও মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আমন মৌসুমের নতুন চাল বাজারে আসার পরও দাম কমার বদলে উল্টো বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে মাঝারি ও সরু চালের বাজারে অস্থিরতা বেশি। বিআর-২৮ বা পাইজামের মতো মাঝারি চালের কেজি এখন ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় ঠেকেছে। আর ভোক্তাদের পছন্দের মিনিকেট চালের দাম যেন আকাশচুম্বী। ব্র্যান্ড ও মানভেদে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮৬ টাকা পর্যন্ত, যা মাত্র ১০ দিন আগেও ৪-৫ টাকা কম ছিল।
চালের বাজারের এই অস্থিরতা নিয়ে বিক্রেতারা বলছেন, নতুন চাল বাজারে এলেও তার সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। এর মধ্যেই মিল পর্যায় থেকে পুরোনো চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রশিদ, মোজাম্মেল বা সাগরের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের চালের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়ছে। নাজিরশাইল চালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র; দেশি ও আমদানি করা নাজিরশাইল কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়ে এখন ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রমজানের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য চিনি ও ডালের বাজারও এখন ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েক মাস চিনির দাম কেজির নিচে থাকলেও বর্তমানে তা আবারও ১০০ টাকার ঘর ছাড়িয়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে খোলা চিনি ১০০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে সরবরাহ কম থাকায় খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব পড়েছে। গত ১৫ দিনে চিনির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডালের বাজারেও স্বস্তি নেই। ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ অ্যাংকর ডালের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। শুধু অ্যাংকর নয়, দেশি ছোট দানার মসুর ডাল এখন ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে মোটা দানার মসুর ডাল কিছুটা স্থিতিশীল থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। রমজান ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এসব পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
এদিকে আমিষের বাজারেও অস্বস্তির খবর। দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকার পর ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার এখন ১৬৫ থেকে ১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগির দামও চড়া, ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। মুরগি বিক্রেতারা বলছেন, খামারি পর্যায়ে মুরগির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব বাজারে পড়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রোজার এখনও এক মাস বাকি, এখনই যদি এই অবস্থা হয় তবে রোজার সময় কী হবে? চাল, ডাল, তেল—সব কিছুর দামই যদি এভাবে বাড়ে, তবে সাধারণ মানুষ খাবে কী?” তার এই প্রশ্ন এখন কোটি সাধারণ মানুষের মনে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রমজানের আগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একদল অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখনই যদি কঠোর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা না যায়, তবে রোজার মধ্যে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাপন দুঃসহ হয়ে উঠবে। সরকারি পর্যায় থেকে আমদানির উদ্যোগ এবং টিসিবির কার্যক্রম আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

