খাবারের তালিকায় ‘করলা’ নামটা শুনলেই অনেকের মুখ তেতো হয়ে যায়। তীব্র তিক্ত স্বাদের এই সবজিটি অধিকাংশ মানুষের পছন্দের তালিকায় সবার নিচে থাকলেও, এর ঔষধি গুণাগুণ কিন্তু প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে ঘরোয়া প্রতিকার এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য করলার রস যুগ যুগ ধরে সমাদৃত। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য সচেতনদের মধ্যে প্রতিদিন সকালে করলার রস পান করার প্রবণতা বাড়ছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমনটি দাবি করা হয়, এর প্রভাব ঠিক ততটা জাদুকরী বা তাৎক্ষণিক নয়। মূলত একটি সুষম জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে নিয়মিত করলার রস পান করলে দীর্ঘমেয়াদে শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
সকালের রুটিনে করলার রস রাখার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এর অসামান্য কার্যকারিতা। করলার মধ্যে চ্যারান্টিন এবং পলিপেপটাইড-পি নামক প্রাকৃতিক যৌগ থাকে, যা অনেকটা ইনসুলিনের মতো কাজ করে। নিয়মিত এই রস পানে শরীরের ইনসুলিন হরমোন সক্রিয় হয়ে ওঠে। যখন ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ করে, তখন রক্তে থাকা চিনি কোষে কোষে শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তা চর্বি হিসেবে জমা হওয়ার সুযোগ পায় না। এটি পরোক্ষভাবে ওজন কমাতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।
তেতো খাবার মানেই যে তা হজমে খারাপ, তা কিন্তু নয়। বরং প্রতিদিন পরিমিত করলার রস পান করলে তা শরীরের হজমকারী এনজাইমগুলোকে উদ্দীপিত করে। এই তিক্ততা পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে, যার ফলে পেট ফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যা কমে আসে। করলা প্রাকৃতিক ফাইবারে ভরপুর হওয়ায় এটি অন্ত্রের চলাচল বা বাওয়েল মুভমেন্ট স্বাভাবিক রাখে। তবে মনে রাখা জরুরি, যাদের পাচনতন্ত্র অতিরিক্ত সংবেদনশীল, তাদের খালি পেটে করলার রস পানে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে। তাই নিজের শরীরের ধরন বুঝে পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
ওজন কমানোর যাত্রায় করলার রস একটি শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে। এতে ক্যালোরির পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং ফাইবার বেশি থাকায় এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এটি পান করলে হুটহাট অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বা ‘ফুড ক্রেভিং’ কমে যায়। তবে কেবল করলার রস খেয়ে ওজন কমানো সম্ভব নয়; এটিকে একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়ামের পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিত।
করলা ভিটামিন সি এবং পলিফেনলের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের চমৎকার উৎস। আমাদের শরীরে প্রতিদিন যে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা কোষের ক্ষয় হয়, তা মোকাবিলায় এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো ঢাল হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত করলার রস পান করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেম শক্তিশালী হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কোষীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে। এটি শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতেও বেশ কার্যকর।
করলার রস শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে এবং খাবারের পর গ্লুকোজের হঠাৎ বৃদ্ধি রোধ করতে সক্ষম। এর প্রদাহ-বিরোধী (anti-inflammatory) গুণাগুণ শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। যখন রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। তবে যারা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ (hypoglycemic drugs) সেবন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে করলার রস পানের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক, কারণ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমিয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, করলার রস কোনো অলৌকিক ওষুধ নয়, বরং একটি পুষ্টিকর পানীয়। তিক্ত স্বাদের কারণে এটি গ্রহণ করা অনেকের জন্য কষ্টকর হলেও এর সুদূরপ্রসারী স্বাস্থ্য উপকারিতা অবহেলা করার মতো নয়। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম শরীর পেতে প্রাকৃতিক এই দাওয়াইকে আপনি আপনার প্রতিদিনের তালিকায় যুক্ত করতেই পারেন।

