চট্টগ্রামের চন্দনাইশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি বিজড়িত রাজপথ আবারও রক্তাক্ত হলো। গত জুলাইয়ের গণআন্দোলনে আহত ও সরকারি গেজেটভুক্ত বীর যোদ্ধা হাসনাত আব্দুল্লাহর ওপর এক বর্বরোচিত সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার বদুরপাড়া এলাকায় এই হামলার শিকার হন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে হাসনাত যখন চন্দনাইশের বদুরপাড়া পাক্কাদোকান এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই অতর্কিত এই আক্রমণ চালানো হয়। ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র দল লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হামলার সময় হাসনাতের সঙ্গে থাকা মাঈনউদ্দীন নামে আরও এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। পেট্রোল পাম্পের সামনের সড়কে সংঘটিত এই হামলায় অপরাধীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে অবস্থান নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্ধকার রাস্তায় হঠাৎ শুরু হওয়া এই তাণ্ডবে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে চন্দনাইশসহ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থানের একজন বীর যোদ্ধার ওপর এমন হামলার ঘটনাকে সাধারণ মানুষ সহজভাবে নিতে পারছে না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রগুলোর ধারণা, এই হামলার পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। সাম্প্রতিক কিছু কর্মসূচির জেরে হাসনাতকে নিশানা করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন তার সহযোদ্ধারা। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগায় তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জুলাইযোদ্ধা জানান, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের এক বিতর্কিত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও গ্রেপ্তারের দাবিতে তারা সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে বিরোধিতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্মারকলিপি দেওয়ার জেরে এই সশস্ত্র হামলা হতে পারে বলে জোরালো সন্দেহ করা হচ্ছে।
চন্দনাইশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই হামলা নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই আসনের এলডিপি প্রার্থী অধ্যাপক ওমর ফারুক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জুলাইযোদ্ধারা এই রাষ্ট্রের সম্পদ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কারিগর। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
ওমর ফারুক আরও যোগ করেন, যারা দেশের পরিবর্তনের জন্য রক্ত দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা মানে পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত। এই ধরনের ভীতি প্রদর্শন চলতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। তিনি অবিলম্বে অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে ঘটনার পর এনসিপি নেতা হাসান আলী তার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হাসনাত আব্দুল্লাহকে নিজের ছোট ভাই সম্বোধন করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের বীর যোদ্ধাদের ওপর এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পরাজিত শক্তির একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
হাসান আলীর মতে, স্বৈরাচারের দোসররা এখনও এলাকায় সক্রিয় রয়েছে এবং তারা সুযোগ পেলেই জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের ওপর চড়াও হচ্ছে। বদুরপাড়ার এই ঘটনাকে তিনি কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না। তিনি প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাসান আলী আগে এনসিপির প্রার্থী ছিলেন। তবে ১১ দলীয় জোট গঠনের পর তিনি অধ্যাপক ওমর ফারুককে সমর্থন দিয়ে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। এই মেরুকরণের ফলে একটি পক্ষ জুলাইযোদ্ধাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল বলে অনেকে ধারণা করছেন।
হামলার শিকার হাসনাত আব্দুল্লাহ জুলাই মাসে রাজপথে থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেই লড়াইয়ে তিনি আহত হন এবং পরবর্তীতে সরকার তাকে বীর হিসেবে গেজেটভুক্ত করে স্বীকৃতি দেয়। নিজের এলাকায় ফিরে এসে তিনি পুনরায় এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তা অনেকেরই কল্পনার বাইরে ছিল।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
হাসনাত ও মাঈনউদ্দীনের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, তারা এই কাপুরুষোচিত হামলার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, হামলাকারীদের বিচার না হলে চন্দনাইশে জুলাইযোদ্ধাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হলে যোদ্ধাদের সুরক্ষা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে যদি বীরদের রক্ত ঝরানো হয়, তবে তা দেশের জন্য অশনিসংকেত।
রাতভর এই উত্তেজনার পর চন্দনাইশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, যারা রাজপথে হামলা চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বিগত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে নির্বাচন কেন্দ্রিক রেষারেষি বেড়েছে। হাসনাতের ওপর এই হামলা সেই উত্তেজনারই একটি বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা দ্রুততার সাথে এই ঘটনার পেছনের মূল কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারে।

