ফরিদপুর শহরের একটি পরিত্যক্ত স্কুল ব্যাগ থেকে উদ্ধারকৃত শক্তিশালী রিমোট কন্ট্রোল বোমাটির সফল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী। রোববার সকাল ১০টার দিকে শহরের বিসর্জন ঘাট সংলগ্ন কুমার নদের পাড়ে ঢাকা থেকে আসা অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) একটি বিশেষজ্ঞ বোম্ব ডিসপোজাল দল এই কার্যক্রম সম্পন্ন করে। রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইসের মাধ্যমে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এই বোমাটি জনাকীর্ণ এলাকায় বড় ধরণের নাশকতার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক শংকর কুমার ঘোষ এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি জানান, উদ্ধারকৃত বস্তুটি অত্যন্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী বোমা ছিল, যা মূলত রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে দূর থেকে সক্রিয় করা সম্ভব। গতকাল শনিবার দুপুরে এই বোমার অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই জননিরাপত্তার স্বার্থে পুরো এলাকাটি কঠোর নজরদারিতে আনা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গতকাল শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। ফরিদপুর শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলীপুর সেতুর দক্ষিণ পাড়ে স্তূপ করে রাখা পাটখড়ির ভেতরে একটি পরিত্যক্ত স্কুল ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও জেলা পুলিশের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ব্যাগ তল্লাশি করে ভেতরে কসটেপ দিয়ে প্যাঁচানো ও বৈদ্যুতিক তারযুক্ত একটি সন্দেহভাজন বস্তু উদ্ধার করা হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আলীপুর সেতুর নিচ সংলগ্ন বিসর্জন ঘাট এলাকায় বালুর বস্তা দিয়ে একটি অস্থায়ী সুরক্ষা বেষ্টনী তৈরি করেন এবং সেখানে বোমাটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে জেলা পুলিশের বিশেষ অনুরোধে ঢাকা থেকে ১০ সদস্যের একটি উচ্চ প্রশিক্ষিত বোম্ব ডিসপোজাল দল শনিবার রাতেই ফরিদপুরে পৌঁছান। রোববার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে তারা বোমাটি নিষ্ক্রিয়করণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেন। নিরাপত্তার স্বার্থে সেই সময় আলীপুর সেতুর দু’পাশে এবং কুমার নদের দুই পাড়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় সেনাবাহিনী ও জেলা পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ দলটির সদস্যরা বোমাটির সঙ্গে অতিরিক্ত তার যুক্ত করে প্রায় ৫০ মিটার দূরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেন। এরপর ইলেকট্রিক সংযোগের মাধ্যমে দূর থেকে কমান্ড দিয়ে বোমাটির সফল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, বিকট শব্দের পাশাপাশি বোমার স্প্লিন্টারগুলো মাটি থেকে অন্তত ২০ ফুট ওপর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে জনমনে সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হলেও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হয়।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমির হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, আলীপুর সেতুর ওপর খড়ির গাদার ভেতরে বোমা রাখা আছে—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই তারা অভিযান চালিয়েছিলেন। স্কুল ব্যাগে রাখা টেপ দিয়ে প্যাঁচানো বস্তুটি যে একটি প্রাণঘাতী বোমা, তা বিশেষজ্ঞ দলের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই রিমোট কন্ট্রোল বোমাটি যে কোনো বড় জমায়েতে প্রাণহানি ঘটানোর সক্ষমতা রাখত।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। বোমাটি কোথা থেকে এল এবং কারা এর পেছনে জড়িত, তা শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষায় শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

