‘আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ, জীবন আমার ধন্য হলো হয়ে বাংলাদেশি বউ’— এক সময়ের চঞ্চল ফরাসি কিশোরী সিনথিয়া ইসলামের মুখে যখন এই ছন্দ শোনা যায়, তখন তা কেবল একটি কথা নয়, বরং সংস্কৃতির মহামিলনের এক অনন্য সুরে পরিণত হয়। ফ্রান্সের লারোসাল শহরের পচিচ জুবের কন্যা সিনথিয়া এখন পুরোদস্তুর বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের পুত্রবধূ। ছোটবেলায় মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত এই ফরাসি নারী আজ তার বাংলাদেশি শাশুড়ির মমতায় সিক্ত। আর সেই ভালোবাসার টানেই সুদূর ফ্রান্স থেকে বারবার ছুটে আসেন লক্ষ্মীপুরের রাজিবপুর গ্রামের শান্ত ও সবুজ পরিবেশে।
সিনথিয়া ও তার স্বামী আরিফুল ইসলাম রাসেলের প্রেমের এই রূপকথা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে রাসেল উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড গিয়ে ২০১৩ সালে থিতু হন ফ্রান্সে। সেখানেই সিনথিয়ার সাথে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব। ফরাসি ভাষা ও ইংরেজি মিশ্রিত এক অদ্ভুত যোগাযোগের মধ্য দিয়ে গুগল ট্রান্সলেটের সহায়তায় শুরু হয় তাদের মনের লেনদেন। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সিনথিয়া খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাসেলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তার নাম রাখা হয় সিনথিয়া ইসলাম। বর্তমানে এই দম্পতির ঘরে রয়েছে ফুটফুটে দুই সন্তান— আমেনা ইসলাম (৬) ও আলিফ ইসলাম (৪)।
ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি এই দম্পতি ডিজিটাল জগতেও এখন তুমুল জনপ্রিয়। ‘রাসেল অ্যান্ড সিনথিয়া’ নামে তাদের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে, যার বর্তমান অনুসারী সংখ্যা প্রায় ২১ লক্ষ। মজার বিষয় হলো, তাদের এই বিপুল অনুসারী কেবল বাংলাদেশেই নয়, বরং এর ৬০ শতাংশই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের। বিশেষ করে আরব বিশ্বের দর্শকরা এই যুগলের সহজ-সরল উপস্থাপনা এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ সৌন্দর্য দেখতে খুব পছন্দ করেন। রাসেল জানান, তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে এবং দেশের মানুষের কাছে বিদেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা।
সম্প্রতি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজের গ্রাম রাজিবপুরে এসেছিলেন রাসেল। সেখানে মেঘনা নদীর তীরে ঘুরে বেড়ানো, গ্রামীণ ঐতিহ্য উপভোগ এবং পারিবারিক মিলনমেলার প্রতিটি মুহূর্ত তারা ক্যামেরাবন্দি করেছেন। সিনথিয়া তার শাশুড়ির হাতের পিঠা খেতে যেমন ভালোবাসেন, তেমনি এদেশের পারিবারিক বন্ধন তাকে অভিভূত করে। ফরাসি ভাষায় সিনথিয়া জানান, ফ্রান্সে পারিবারিক বন্ধনগুলো বেশ আলগা, কিন্তু বাংলাদেশে একে অপরের প্রতি যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তিনি দেখেছেন, তা তাকে বারবার এ দেশে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করে। নিরহংকারী সিনথিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথেও খুব দ্রুত মিশে যেতে পারেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রাসেল জানান, তিনি চান তার সন্তানরা যেন ফরাসি সংস্কৃতির পাশাপাশি তাদের শেকড় বাংলাদেশের কৃষ্টি ও ভাষাকেও হৃদয়ে ধারণ করে। তিনি ছয় মাস ফ্রান্সে এবং ছয় মাস বাংলাদেশে থাকার পরিকল্পনা করছেন, যাতে সন্তানদের মাতৃভূমির সাথে নাড়ির টান অটুট থাকে। যদিও সন্তানদের পূর্ণাঙ্গ বাংলা শেখানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও রাসেল বিশ্বাস করেন রক্তের টানেই তারা একদিন এদেশের মাটিকে আপন করে নেবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকালে এই দম্পতি সন্তানদের নিয়ে পুনরায় ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন। তবে যাওয়ার আগে তারা রেখে গেছেন একরাশ শুভকামনা আর এক অনন্য বার্তা— ভালোবাসা কোনো মানচিত্র বা ভাষার সীমানা মানে না। সিনথিয়া ইসলামের মতো হাজারও বিদেশিনী যখন এদেশের পুত্রবধূ হয়ে গর্ববোধ করেন, তখন তা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চিরায়ত আতিথেয়তা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের জয়গানই গেয়ে যায়।

