কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সশস্ত্র দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে সংঘটিত এই সহিংসতায় নুর কামাল (২৫) নামের এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছেন। শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নিহতের মরদেহ বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া ২৬ নম্বর নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আই-ব্লকে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো বিরোধের জেরে রোহিঙ্গা শিবিরের দুই প্রভাবশালী গোষ্ঠী—নুর কামাল গ্রুপ ও খালেক গ্রুপের সদস্যরা অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বন্দুকযুদ্ধে পুরো ক্যাম্প এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গোলাগুলির শব্দে গভীর রাতে অনেকের ঘুম ভেঙে যায় এবং ভয়ে কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পাননি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ কাউছার সিকদার জানান, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই সহিংসতা। সংঘর্ষ চলাকালে নুর কামাল নামের ওই ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হন।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এপিবিএন সূত্রে আরও জানা গেছে, নিহত নুর কামাল ওই এলাকার একজন চিহ্নিত অপরাধী ছিলেন এবং তিনি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে ক্যাম্পসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংঘর্ষের খবর পাওয়ামাত্রই এপিবিএন পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধীরা দ্রুত গহীন পাহাড় ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ক্যাম্পজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
দীর্ঘ কয়েক মাস অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হঠাৎ এই গোলাগুলির ঘটনায় সাধারণ আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাম্পের একজন ‘মাঝি’ (রোহিঙ্গা নেতা) জানান, মধ্যরাতে গোলার বিকট আওয়াজে নারী ও শিশুরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা আর কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত চান না।
সাধারণ রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও জোরালো হস্তক্ষেপ ও সার্বক্ষণিক নজরদারি দাবি করেছেন। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোও এ ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে মানবিক সহায়তার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছে।

