পদ্মাপাড়ের জেলা রাজবাড়ীতে রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে হাহাকার শুরু হয়েছে। গত প্রায় ১০ দিন ধরে জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ের খুচরা দোকানগুলোতে মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। এর ফলে গৃহস্থালির রান্নাবান্না থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁর স্বাভাবিক কার্যক্রম থমকে দাঁড়িয়েছে। তীব্র শীতের মৌসুমে জ্বালানির এই সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ বয়ে এনেছে।
রাজবাড়ী সদর, গোয়ালন্দ ও পাংশা উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ খুচরা দোকান এখন গ্যাস সিলিন্ডার শূন্য। ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনে ‘গ্যাস নেই’ লিখে ঝুলাতে বাধ্য হয়েছেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহকারী বা ডিলার পর্যায় থেকে তারা দীর্ঘ এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো নতুন সরবরাহ পাচ্ছেন না। দোকানে মজুদ থাকা শেষ সিলিন্ডারটিও কয়েকদিন আগে বিক্রি হয়ে গেছে। এখন ক্রেতারা সিলিন্ডার নিয়ে এসে ফিরে যাচ্ছেন, যা ব্যবসায়ীদের জন্য মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণ অনুসন্ধানে ডিলার ও কোম্পানি পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় ডিলারদের দাবি, মূল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো থেকে তাদের চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। অনেক সময় পরিবহন নিয়ে ডিপোতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও খালি ট্রাকে ফিরে আসতে হচ্ছে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে জাহাজ জট বা ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত গ্যাসের সরবরাহ কমার অজুহাত দেওয়া হচ্ছে।
তবে সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বড় একটি চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। তারা বলছেন, কোম্পানি পর্যায় থেকে সরবরাহ কম থাকলেও ডিলারদের কাছে গোপন মজুদ থাকতে পারে।
গ্যাসের এই দুষ্প্রাপ্যতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। জরিমানার ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখলেও আড়ালে দ্বিগুণ দামে লেনদেন করছেন বলে জানা গেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, রাজবাড়ীর সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন, বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার মূল কারণ সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইনের ত্রুটি। তিনি বলেন, “খুচরা ব্যবসায়ীরা ডিলারদের দোষ দিচ্ছেন, আর ডিলাররা কোম্পানির ওপর দায় চাপাচ্ছেন। তবে দেশজুড়ে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে যে অঘোষিত অস্থিরতা চলছিল, তা সমাধানের পথে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ১০ জানুয়ারির পর থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।”
বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডারের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবার মাটির চুলা বা ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু লোডশেডিং এবং লাকড়ির উচ্চমূল্যের কারণে সেটিও সহজসাধ্য হচ্ছে না। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাসকারী এবং হোটেল ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মহাবিপদে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রাজবাড়ীর জনজীবনে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

