সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে হরিণ শিকারিদের পাতা মরণফাঁদে আটকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘকে সফলভাবে উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। দীর্ঘ রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর ‘ট্রানকুইলাইজার গান’ ব্যবহার করে বাঘটিকে অচেতন করার মাধ্যমে ফাঁদ থেকে মুক্ত করা হয়। আজ রোববার দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে বাঘটিকে খাঁচাবন্দি অবস্থায় জঙ্গল থেকে বের করে নিয়ে আসেন বনকর্মীরা। বর্তমানে বাঘটি শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ায় সেটিকে জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির এই উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তিনি জানান, বাঘটি দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকায় এবং বাঁচার জন্য ছটফট করায় বেশ ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেটির শরীর থেকে পানিশূন্যতা রোধে তাৎক্ষণিকভাবে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বাঘটিকে বিশেষ খাঁচায় করে খুলনায় অবস্থিত বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেস্কিউ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে বাঘটির শারীরিক পরীক্ষা ও নিবিড় চিকিৎসা শেষে সেটিকে পুনরায় বনে অবমুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার দুপুরে। বন বিভাগ গোপন সূত্রে খবর পায় যে, লোকালয় থেকে সুন্দরবনকে পৃথক করা শরকির খাল দিয়ে বনের প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে বৈদ্যমারি ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন এলাকায় একটি বাঘ হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকে পড়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাঘটির অবস্থান নিশ্চিত করেন। বাঘটিকে নিরাপদে উদ্ধারের জন্য ঢাকা থেকে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জনসহ একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং খুলনা থেকে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
এদিকে বনের ভেতরে বাঘ আটকে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শনিবার সন্ধ্যা থেকেই বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজার এলাকার হাজার হাজার উৎসুক জনতা বাঘটি দেখার জন্য ভিড় করতে শুরু করেন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বনে প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও, রোববার সকালে হাজার হাজার মানুষ শরকির খালের পাড়ে জড়ো হন। ভিড়ের চাপে উদ্ধার অভিযান কিছুটা বিঘ্নিত হলেও শেষ পর্যন্ত বেলা আড়াইটার দিকে বিশেষজ্ঞ দল বাঘটিকে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করতে সক্ষম হন।
খুলনা কার্যালয়ের মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও স্মার্ট ডাটা কো-অর্ডিনেটর মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, “উৎসুক জনতার প্রচণ্ড ভিড় সামলে বাঘটিকে উদ্ধার করে বের করে আনা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাঘটি শিকারিদের তারের ফাঁদে আটকে ছিল, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। উদ্ধারের পর আমরা দ্রুত সেটিকে মোংলা হয়ে খুলনার পথে নিয়ে রওনা হয়েছি।”
পরিবেশবাদীরা সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এমন শিকারিদের তৎপরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বনের রাজা বাঘের এভাবে ফাঁদে আটকে পড়া বনপাহারা ও নিরাপত্তার ঘাটতিকেই নির্দেশ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন বিভাগ জানিয়েছে, এই ফাঁদ পাতার পেছনে কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত সবার নজর উদ্ধারকৃত বাঘটির দ্রুত সুস্থতার দিকে।

