বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দীর্ঘ ১৭ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও গত দেড় দশকে সংঘটিত গুম, খুন এবং জুলাই-আগস্টের গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগ কোনো ধরনের অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশ করেনি। এই দীর্ঘ নীরবতা এবং বিদেশের মাটিতে বসে অপপ্রচার চালানোর কারণে দলটির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এখন শূন্যের কোঠায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা যদি ভুল স্বীকারও করে, তবে দেশের মানুষের কাছে তার আর কোনো বিশেষ গুরুত্ব বা মূল্য থাকবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শুক্রবার সকালে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকার ঐতিহ্যবাহী গৌর গোপাল সেবা আশ্রম পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে আমরা সবাই ভুল করতে পারি, তবে ভুলের পর অনুতপ্ত হওয়া এবং ক্ষমা চাওয়া একটি মানবিক গুণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ গত দেড় বছরে তাদের শাসনামলে হওয়া অমানবিক অপরাধগুলোর জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হওয়ার লক্ষণ দেখায়নি। বরং তারা এখনও শান্তিপূর্ণ পথে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সময়ের এই দীর্ঘ ব্যবধানে তারা মানুষের আস্থা এতটাই হারিয়েছে যে, এখন তাদের ‘দুঃখ প্রকাশ’ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই হবে না।
শফিকুল আলম তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, দলটির বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ প্রচার করছে যে আন্দোলনে তিন হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। এই মিথ্যাচারের মূল উদ্দেশ্য হলো জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবে অংশ নেওয়া লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে উপস্থাপন করা। তারা বিশ্ব দরবারে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে, আন্দোলনকারীরা সন্ত্রাসী ছিল, যাতে তাদের ওপর চালানো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়ন বৈধতা পায়। কিন্তু এই ধরনের ঘৃণ্য অপকৌশল বাংলাদেশের সচেতন মানুষ আর মেনে নেবে না।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে সংকটে ফেলবে কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব সরাসরি তা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলে নির্বাচন গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে, এমন ধারণা কেবল কল্পনাপ্রসূত। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন কোনো ভাবনা নেই। বরং দীর্ঘ সময় পর দেশের মানুষ একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন কোনো রাজনৈতিক দল নিজ দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর অস্ত্র তুলে নেয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে গণহত্যা চালায় এবং গুম-খুনের সংস্কৃতি চালু করে, তখন সেই দল তার রাজনৈতিক নৈতিকতা হারায়। পৃথিবীর কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের অপরাধে লিপ্ত কোনো শক্তিকে আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কার্যত, নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নৈতিক যোগ্যতা হারিয়েছে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে শফিকুল আলম আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির আর কোনো উজ্জ্বল সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান শক্তি হলো জনগণের সমর্থন ও নৈতিক ভিত্তি, যার উভয়টিই আওয়ামী লীগ হারিয়েছে। তিনি মনে করেন, যে দল নিজের দেশের মানুষকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নির্বিচারে রক্তপাত ঘটায়, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই তাদের স্থান হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হবে।
ব্যক্তিগত পরিকল্পনার বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে শফিকুল আলম জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তিনি পুনরায় তার পুরোনো পেশা সাংবাদিকতায় ফিরে যেতে চান। সাংবাদিকতা তার প্রাণের জায়গা এবং সেখান থেকেই তিনি দেশ ও মানুষের সেবা করে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
এর আগে সকালে শফিকুল আলম নিজনান্দুয়ালীস্থ গৌর গোপাল সেবা আশ্রমে পৌঁছালে আশ্রম কর্তৃপক্ষ তাকে স্বাগত জানান। তিনি আশ্রমের মন্দির, সেবামূলক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি আশ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। আশ্রমের ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবিক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে এ ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে দুস্থ ও অসহায় মানুষের সেবায় তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টা সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আশ্রমের ভক্ত এবং বিভিন্ন স্তরের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রেস সচিবের এই সফরকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। মাগুরার কার্যক্রম শেষ করে তিনি শ্রীপুর উপজেলার দারিয়াপুর ইউনিয়নের চৌগাছি গ্রামে তার নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেস সচিবের এই বক্তব্য সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন, যা আগামী দিনের নির্বাচনী রোডম্যাপ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে।

