আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে প্রার্থী হওয়া গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের বার্ষিক আয় এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামা অনুযায়ী তার বাৎসরিক আয় ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা, যা দেশের শীর্ষ অনেক রাজনৈতিক নেতার ঘোষিত আয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। এই তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর শুরু হয় নানা বিতর্ক ও কৌতূহল। সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে পটুয়াখালী জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিজের আয়ের উৎস ও হলফনামার স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন নুর।
বৃহস্পতিবার পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার সম্মেলন কক্ষে যাচাই-বাছাই শেষে নুরুল হক নুরের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচনী হলফনামা হলো এমন একটি দলিল, যা দেখলে একজন রাজনীতিবিদের সততা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বোঝা যায়। আমি আমার যতটুকু সম্পদ ও আয় আছে, তার সবটুকুই সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছি। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই।”
নিজের বার্ষিক ২০ লাখ টাকা আয়ের উৎস সম্পর্কে নুর বলেন, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ছাত্রাবস্থায় টিউশনি করেও মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করতাম। ২০১৯ সাল থেকে আমি পেশাদার কর্মজীবনে যুক্ত। আমার আয়কর রিটার্নে আমি স্পষ্ট উল্লেখ করেছি যে, আমার একটি ডেভেলপার কোম্পানি ও একটি কনসালটেন্সি ফার্মের সাথে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া আমার নিজস্ব একটি কৃষি সেবা (এগ্রিকালচারাল সার্ভিস) ব্যবসা রয়েছে। আগস্ট বিপ্লবের পর থেকে আপনারা আমাকে নিয়মিত টেলিভিশনের টকশোতে দেখছেন। টকশো থেকেও প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা সম্মানী পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় করা একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং যার এইটুকু আয় নেই, তার তো নির্বাচনে আসাই কঠিন।”
হলফনামায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এই তুলনামূলক পার্থক্যের বিষয়ে নুর বলেন, “তারেক রহমান সাহেব একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তান। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের পর তার ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ অর্জনের চিন্তা না থাকাই স্বাভাবিক। এছাড়া তার প্রতি মানুষের যে আবেগ ও ভালোবাসা আছে, তাতে তার প্রয়োজন হলে মানুষ এক ঘণ্টার মধ্যে হাজার কোটি টাকা বিলিয়ে দেবে। অন্যদিকে জামায়াতের মতো বড় দলের শীর্ষ নেতাদের খরচ অনেক সময় দল থেকেই বহন করা হয়।” তিনি দাবি করেন, অন্যান্য অনেক প্রার্থীর হলফনামা সঠিকভাবে যাচাই করলে তথ্যের বড় ধরনের গরমিল পাওয়া যাবে, যা তার ক্ষেত্রে নেই।
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যয়ের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভিপি নুর বলেন, “বাস্তবতা হলো, কোনো প্রার্থীই নির্ধারিত সীমার মধ্যে নির্বাচন শেষ করতে পারেন না। বাংলাদেশে বর্তমানে ২ থেকে ৫ কোটি টাকার নিচে কোনো আসনে নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব। আমরা রাজনীতিতে এই কালো টাকা, পেশিশক্তি এবং আধিপত্যের আমূল পরিবর্তন চাই। অনেকেই হলফনামায় ২০ ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ টাকা লিখেছেন, যা হাস্যকর। আমি মনে করি শুরু থেকেই প্রত্যেক প্রার্থীর সততার পরিচয় দেওয়া উচিত।”
পটুয়াখালী-৩ আসনে নুরুল হক নুর মূলত বিএনপি জোটের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তবে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সদ্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন। আজ বাছাই শেষে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মো. শহীদ হোসেন চৌধুরী ভিপি নুর ও হাসান মামুনসহ মোট পাঁচজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নুরের এই স্পষ্টবাদিতা ও আয়ের স্বচ্ছতা ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলেও, এটি নির্বাচনি প্রচারণায় তাকে একটি ‘সৎ ও আধুনিক’ ইমেজ দিতে সহায়তা করবে। পটুয়াখালী-৩ আসনে এখন মূল লড়াই হবে নুরের ‘পরিবর্তনের স্লোগান’ বনাম অভিজ্ঞ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাংগঠনিক শক্তির মধ্যে।

