বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁর জীবনের দীর্ঘ এবং কণ্টকাকীর্ণ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। তবে তাঁর এই বিদায় কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক মামলার বেড়াজাল ছিন্ন করে এক অনন্য আইনি বিজয়ের গল্প। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা প্রতিটি মামলা থেকে আইনগতভাবে মুক্তি পেয়েছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ আসন থেকে তাঁর দাখিল করা হলফনামা এবং আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছিলেন।
তথ্যাদি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (ওয়ান-ইলেভেন) এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সর্বমোট ৩৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ ও ‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ মামলায় তাঁকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সেই দণ্ড নিয়ে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয় যে, এসব মামলার অধিকাংশ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফসল। ফলশ্রুতিতে ২২টি মামলায় তিনি আদালত কর্তৃক সরাসরি খালাস পান এবং বাকি ১৩টি মামলায় তাঁকে দায়মুক্তি বা অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
হলফনামার বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল বৈচিত্র্যময় এবং বিস্ময়কর। এর মধ্যে ছিল দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি, হত্যা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মতো গুরুতর অভিযোগ। এমনকি তাঁর জন্মদিন নিয়েও মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৭ সালে ২টি, ২০১০ সালে ১টি, ২০১৩ সালে ১টি, ২০১৪ সালে ২টি, ২০১৫ সালে ১৬টি, ২০১৬ সালে ১০টি, ২০১৭ সালে ২টি এবং ২০২৪ সালে ১টি মামলা করা হয়। ঢাকা ছাড়াও কুমিল্লা, খুলনা, নড়াইল ও পঞ্চগড়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এসব মামলার বাদী হয়েছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার আইনি জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় ছিল তাঁর কারাজীবন। দীর্ঘ দুই বছর এক মাস ১৬ দিন তিনি কারাগারে কাটান। পরবর্তীতে করোনা মহামারির সময় তাঁর সাজার কার্যকারিতা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা চরম অবনতি হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি তৎকালীন সরকার। দীর্ঘ এই অবরুদ্ধ জীবন এবং চিকিৎসার অভাবে তাঁর শারীরিক জটিলতাগুলো প্রকট আকার ধারণ করে। আইনজীবীদের মতে, গত দুই বছরে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দ্রুততার সঙ্গে এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয় এবং ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তিনি পুরোপুরি ‘মামলামুক্ত’ নাগরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার নিজ জেলা ফেনীর রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই আইনি বিজয় নিয়ে বইছে মিশ্র অনুভূতি। ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল এক বিবৃতিতে বলেন, “শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করতে আমাদের নেত্রীকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছিলেন। তিনি ঢাকায় অবস্থান করার সময়ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে হামলার ঘটনায় তাঁকে হুকুমের আসামি করা হয়েছিল। এই প্রতিহিংসামূলক মামলাগুলোর কারণে তিনি সুচিকিৎসা পাননি, যা তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।” তিনি আরও বলেন, “আজ আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে বেগম জিয়া সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন এবং তিনি আজীবন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বীরের মতো বিদায় নিয়েছেন।”
আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার এই মামলামুক্ত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নজির। একজন শীর্ষস্থানীয় নেত্রীকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার জন্য যেভাবে আইনের ব্যবহার করা হয়েছিল, বিচার বিভাগ শেষ পর্যন্ত সেই কলঙ্ক মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। আজ যখন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তাঁর কফিনের পাশে থাকা জাতীয় পতাকার পাশাপাশি এই আইনি বিজয় তাঁর ভক্ত-সমর্থকদের কাছে এক বড় সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আজীবন নিজেকে ‘আপসহীন’ দাবি করে আসতেন, আর মৃত্যুর আগে মামলা থেকে এই বিজয় তাঁর সেই দাবিকেই যেন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করল।

