বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংঘাতমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ ভোট প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে রংপুর নগরীর একটি বেসরকারি হোটেলের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় বক্তারা এই আহ্বান জানান। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) আয়োজিত এই সভায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল ন্যায়বিচার, জাতীয় ঐক্য এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। এই ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে হবে, যেখানে সহিংসতার কোনো স্থান থাকবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে সফল করতে হলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং রাজনৈতিক আচরণের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মানবিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনই পারে একটি টেকসই ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা উপহার দিতে।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও উল্লেখ করেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো পুনর্গঠনের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। তিনি বলেন, “আমাদের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে উসকানি, ঘৃণা ছড়ানো, সামাজিক বিভাজন এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের অপব্যবহার নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এসব অশুভ তৎপরতা রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর সচেতনতার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করার বিকল্প নেই।”
মতবিনিময় সভায় রংপুর-৩ আসনের প্রার্থীরা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে নির্বাচনী পরিবেশ ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ফলে এবার নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আবেগ ও উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। তিনি আগামীতে নির্বাচনী আচরণবিধি পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে তা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ সময় তিনি দেশের সার্বিক সংস্কারের প্রশ্নে আসন্ন গণভোটে ইতিবাচক রায় দিয়ে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমিরুজ্জামান পিয়াল বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, রংপুর দীর্ঘকাল ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। নির্বাচিত হতে পারলে তিনি এই বৈষম্য দূর করে জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া গণভোটে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপি প্রার্থীর প্রতিনিধি ডক্টর রোকনুজ্জামান তার বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানের ঘোষিত ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা’র কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল রংপুরের উন্নয়ন নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এবার ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ তার উপযুক্ত জবাব দেবে। গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ধানের শীষের পক্ষেই গণজোয়ার সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি আনোয়ারা ইসলাম রাণী বলেন, প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায় এবং রংপুর অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণভোট বা বড় কোনো জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্যের অভাবকে তিনি সংকীর্ণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অতীতে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ন্যায়বিচারের অভাব দেশকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ভবিষ্যতের সরকারকে অবশ্যই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বক্তারা একমত হন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা জরুরি। সহিংসতা পরিহার করে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠান এখন সময়ের দাবি।
গণসংহতি আন্দোলনের রংপুর মহানগর আহ্বায়ক আব্দুল জব্বার, জেলা সুজনের সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিনসহ সভায় আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন। বক্তারা ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং শিক্ষার্থীসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে বলে সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

