হাড়কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা যমুনা নদীর মাঝখানে দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা আটকে থাকার পর অবশেষে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৭ জন বরযাত্রীবাহী একটি নৌকা। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এই উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে, যখন নৌকাটি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জামথল ঘাটে নিরাপদে পৌঁছায়। মাদারগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তত্ত্বাবধানে স্থানীয়দের সহায়তায় এই উদ্ধার অভিযান সফল হয়।
ঘটনার সূত্রপাত পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সকালে মাদারগঞ্জ উপজেলার তারতাপাড়া এলাকার সানোয়ার হোসেনের ছেলে নিলয় হাসান ছানির (২০) বিয়ের উদ্দেশ্যে ৪৭ জন বরযাত্রী বগুড়া শহরের সাবগ্রাম এলাকায় যান। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নবদম্পতিসহ বরযাত্রীরা সন্ধ্যা ৬টার দিকে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কালীতলা ঘাট থেকে নৌকায় করে মাদারগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
মাঝ নদীতে বিভীষিকাময় রাত নৌকাটি যমুনার মাঝপথে পৌঁছালে হঠাৎ চারপাশ ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। দৃষ্টিসীমা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় নৌকার মাঝি দিক হারিয়ে ফেলেন। রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কুয়াশার গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে না পেয়ে নিরুপায় হয়ে যাত্রীরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দিয়ে সাহায্য চান। তবে ঘন কুয়াশা ও চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উদ্ধারকারী দল তাদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। কোনো উপায় না দেখে মাঝ নদীতেই নৌকা নোঙর করে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন তারা।
নৌকাটিতে ১৭ জন নারী ও ৯ জন শিশু ছিল, যাদের মধ্যে ৪ জন শিশুর বয়স মাত্র এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে। তীব্র শীত আর খোলা নদীর হিমেল হাওয়ায় শিশু ও নারীদের নিয়ে চরম মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বরযাত্রী আক্তার মিয়া সেই রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “একদিকে কনকনে শীত, অন্যদিকে নিরাপত্তার ভয়—ছোট বাচ্চা আর মহিলাদের নিয়ে সারারাত এক বিভীষিকার মধ্য দিয়ে পার করেছি। মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।”
উদ্ধার অভিযান মাদারগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর দেলোয়ার হোসেন জানান, খবর পাওয়ার পর থেকেই তারা উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু কুয়াশার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শনিবার ভোরে একটি মাছ ধরার নৌকার সাহায্যে যাত্রীরা জামথল ঘাটের দিকে আসার চেষ্টা শুরু করেন। পরবর্তীতে জামথল ঘাট থেকে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের পাঠানো আরেকটি নৌকার সাহায্যে দুপুর ১২টার দিকে সবাইকে নিরাপদে ঘাটে নিয়ে আসা হয়।
বরের বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম বাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, “শীতের এই দীর্ঘ রাত আমাদের জীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তবে আল্লাহর রহমতে আমরা সবাই সুস্থভাবে ফিরতে পেরেছি।”
মাদারগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকৃত সকল যাত্রী বর্তমানে সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন এবং তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যমুনার বুকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

