দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর আজ এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পৌঁছেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর এই আগমনকে কেন্দ্র করে সাভারের নবীনগর থেকে শুরু করে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ পর্যন্ত পুরো এলাকা এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এক উৎসবমুখর এবং আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল গড়ানোর সাথে সাথে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। নবীনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক পর্যন্ত তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে এবং জাতীয় বীরদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদনের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে সকাল থেকেই সাভারে অবস্থান নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। নেতাকর্মীদের হাতে থাকা বর্ণিল ব্যানার, ফেস্টুন এবং জাতীয় পতাকায় ছেয়ে গেছে মহাসড়কের দুই পাশ। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে সাভারের আকাশ-বাতাস, যা দীর্ঘ সময় পর বিএনপি নেতৃত্বের তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের এক শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে।
স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মতে, তারেক রহমানের এই সাভার সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি তাঁর গভীর অঙ্গীকারের প্রতীক। ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুল আহসান রাশেদ এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত সম্পর্কে বলেন, “আজকের এই দিনটি আমাদের জন্য পরম আনন্দের এবং গর্বের। আমরা দীর্ঘ ১৯ বছর আমাদের নেতাকে এভাবে কাছে পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করেছি।
দুপুর থেকেই নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে এখানে সমবেত হয়েছেন কেবল তাঁদের প্রিয় অভিভাবককে স্বাগত জানাতে।” একইভাবে আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর জানান, এই দিনটির জন্য তাঁরা দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরেছেন এবং আজ লাখো মানুষের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তারেক রহমানই দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাধারণ কর্মীদের মাঝেও ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। মামুন হোসেন নামে এক কর্মী তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “আমাদের নেতা আমাদের মাটিতে ফিরে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন, এটি আমাদের জন্য ভাগ্যের বিষয়। সকাল থেকেই এখানে আছি, আমাদের ক্লান্তি নেই, কেবল আনন্দ আছে।” উল্লেখ্য যে, গতকাল বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বীরের বেশে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। বিমানবন্দরে অবতরণের পর তিনি প্রথমে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকায় এক বিশাল সংবর্ধনায় অংশ নেন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে গিয়ে তাঁর অসুস্থ মা, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
আজকের কর্মসূচি অনুযায়ী, বিকেলে শেরেবাংলা নগরে তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত শেষ করে তিনি সরাসরি সড়কপথে সাভারের উদ্দেশে রওনা হন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর পিতার স্মৃতিধন্য স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছানোর পর তিনি মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এরপর তিনি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।
নিরাপত্তার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্মৃতিসৌধ ও এর সংলগ্ন মহাসড়কে পুলিশ, বিজিবি এবং গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে যাতে লাখো মানুষের এই ভিড় সামাল দিয়ে কর্মসূচিটি সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়। তারেক রহমানের এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক পদচারণা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হলো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাভারের এই জনস্রোত কেবল একটি রাজনৈতিক জমায়েত নয়, বরং এটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের গণতন্ত্রের পথে এক নতুন অভিযাত্রার বলিষ্ঠ পদধ্বনি।

